সব দেখুনমত-মতান্তর

চেকের মামলা

সব দেখুনউত্তরাধিকার আইন

জমির আইন

যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ পুরুষের জন্য কতটা সহায়ক?

যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ রহিতক্রমে ২০১৮ সালে নতুন করে যৌতুক নিরোধ আইন পাশ করা হয়েছে।যৌতুক আইনের অপব্যবহার করে এক শ্রেণীর নারীরা আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করে পুরুষদেরকে হয়রানি করতো।আইনের এই অপব্যবহার রোধে কার্যকর কোন ধারা সন্নিবেশিত না থাকায় মূলত: ১৯৮০ সালের আইনটি বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এছাড়া যৌতুকের সংজ্ঞাসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আদালতে ধুম্রজাল সৃষ্টি হওয়ায় নতুন করে আইন প্রণয়ন করার দাবি ওঠে। এরই প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে যৌতুক নিরোধ আইনটি নতুন করে প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮০ সালের আইন এবং ২০১৮ সালের নতুন আইন পাশাপাশি রাখলে বেশ কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে।  

বিয়ের পক্ষ
১৯৮০ সালের আইনটি ইংরেজিতে ছিল কিন্তু ২০১৮ সালের নতুন আইনটি বাংলায় প্রণয়ন করা হয়েছে। পুরাতন আইনে বিবাহের পক্ষের কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি কিন্তু নতুন আইনে প্রথমেই বিয়ের পক্ষগণের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। নতুন আইনে ‘‘পক্ষ’’ অর্থ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, বিবাহের বর বা কনে অথবা বর বা কনের পিতা-মাতা অথবা বর বা কনের পিতা-মাতার অবর্তমানে বৈধ অভিভাবক অথবা প্রত্যক্ষভাবে বিবাহের সহিত জড়িত বর বা কনে পক্ষের অন্য কোনো ব্যক্তি। 

যৌতুকের সংজ্ঞা
পুরাতন আইনে যৌতুক এর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে বিষয়বস্তু প্রসঙ্গের পরিপন্থী না হইলে এই আইনে “যৌতুক” বলিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, প্রদত্ত যে কোন সম্পত্তি বা “মূল্যবান জামানত”কে বুঝাইবে, যাহা-

ক) বিবাহের একপক্ষ অপরপক্ষে অথবা

খ) বিবাহের কোন একপক্ষের পিতামাতা বা অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক বিবাহের যে কোন পক্ষকেবা অন্য কোন ব্যক্তিকে বিবাহ মজলিশে অথবা বিবাহের পূর্বে বা পরে, বিবাহের পণরূপে প্রদান করে বা প্রদান করিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় : তবে, যৌতুক বলিতে মুসলিম ব্যক্তগত আইন (শরিয়ত) মোতাবেক ব্যবস্থিত দেনমোহর বা মোহরানা বুঝাইবে না।

ব্যাখ্যা : ১) সন্দেহ নিরসনকল্পে এতদ্বারা জ্ঞাত হইল যে, বিবাহের সহিত সরাসরি সম্পর্কিত নহেন এমন কোন ব্যক্তিকর্তৃক স্বামী বাস্ত্রী, যে কোন পক্ষকে অনধিক পাঁচশত টাকা মূল্যমানের কোন জিনিস, বিবাহের পণ হিসাবে নহে, উপঢৌকনরূপে প্রদান করিলে, অনুরূপ উপঢৌকন এই ধারা মতে যৌতুক হিসাবে গণ্য হইবে না।

ব্যাখ্যা : ২) দন্ডবিধির (ইং ১৯৮০ সালের ৪৫ নম্বর আইনের) ৩০ ধারায় “মূল্যবান জামানত” যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, এই আইনেও ঐ শব্দাবলী একই অর্থ বুঝাবে।


নতুন আইনে যৌতুকের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘‘যৌতুক’’ অর্থ বিবাহের এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষের নিকট বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বশর্ত হিসাবে বিবাহের সময় বা তৎপূর্বে বা বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকাকালে, বিবাহ অব্যাহত রাখিবার শর্তে, বিবাহের পণ বাবদ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, দাবিকৃত বা বিবাহের এক পক্ষ কর্তৃক অপর পক্ষেকে প্রদত্ত বা প্রদানের জন্য সম্মত কোনো অর্থ-সামগ্রী বা অন্য কোনো সম্পদ, তবে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়াহ্) প্রযোজ্য হয় এমন ব্যক্তিগণের ক্ষেত্রে দেনমোহর বা মোহরানা অথবা বিবাহের সময় বিবাহের পক্ষগণের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা শুভাকাঙ্ক্ষী কর্তৃক বিবাহের কোনো পক্ষকে প্রদত্ত উপহার-সামগ্রী ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে না।
   
নতুন আইনে ব্যাখ্যা উঠিয়ে দিয়ে সংজ্ঞার ভিতরে বিস্তারিত বলে দেয়া আছে কোনগুলো যৌতুক আর কোনগুলো যৌতুকের অন্তর্ভূক্ত নয়। “এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষের নিকট বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বশর্ত হিসাবে/বিবাহ অব্যাহত রাখিবার শর্তে,” কথাগুলো সংযোজন করা হয়েছে  যা নিয়ে এতদিন যৌতুক আইন ব্যাখ্যার সময় ধুম্রজাল সৃষ্টি হত।


 
যৌতুক দাবি করিবার দণ্ড
পুরাতন আইনের চার ধারায় যৌতুক দাবি করার শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছিল। এই ধারা মতে কোন ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কনে বা বরের পিতামাতা বা অভিভাবকের নিকট যৌতুক দাবী করিলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কিন্তু অন্যূন ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অর্থদন্ড অথবা উভয় বিধ প্রকারে দন্ডনীয় হইবে।  

এই আইন অনুসারে অপরাধ হতে হলে যে কোন ব্যক্তি কর্তৃক ত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কনে বা বরের পিতামাতা বা অভিভাবকের নিকট যৌতুক দাবী করা লাগত। বর বা কনের নিকট যৌতুক দাবি করলে সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো না এবং সাজা হিসেবে কারাদন্ডের পরিমাণ থাকলেও অর্থদন্ডের কোন পরিমাণ উল্লেখ ছিল না।

কিন্তু নতুন আইনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কনে বা বরের পিতামাতা বা অভিভাবকের নিকট যৌতুক দাবী না করে শুধুমাত্র বর বা কনের নিকট যৌতুক দাবি করলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই আইনের তিন ধারায় বলা হয়েছে যে, যদি বিবাহের কোনো এক পক্ষ, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, বিবাহের অন্য কোনো পক্ষের নিকট কোনো যৌতুক দাবি করেন, তাহা হইলে উহা হইবে এই আইনের অধীন একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কিন্তু অন্যূন ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।



এখানে এক পক্ষ আরেক পক্ষের নিকট যৌতুক দাবি করলেই সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। আর পক্ষের সংজ্ঞায় আমরা আগেই দেখেছি পক্ষ অর্থ বর বা কনেকেও অন্তভুক্ত করে।

মিথ্যা মামলা দায়ের, ইত্যাদির দণ্ড
পুরুষের জন্য সবচেয়ে সহায়ক যে ধারাটি নতুন আইনে সংযোজন করা হয়েছে তা হলো ৬ নং ধারা। এই ধারায় বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের অভিপ্রায়ে উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা বা অভিযোগ করিবার জন্য ন্যায্য বা আইনানুগ কারণ নাই জানিয়াও মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেন বা করান, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

কোন ব্যক্তি যদি শুধুমাত্র অপর ব্যক্তিকে হয়রানি বা ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে এই আইনের অপব্যবহার করে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন তাহলে তিনি মিথ্যা মামলা করার জন্য শাস্তি পাবেন।  এই বিধানটি পুরাতন আইনে ছিল না। 

আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় হলো পুরাতন আইনে অপরাধ আমলে নেয়ার  ক্ষেত্রে তামাদির বিধান থাকলেও নতুন আইনে এই বিধানটি উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যৌতুকের অপরাধ সংঘঠিত হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী এক বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করার বাধ্যবাধকতা ছিল পুরাতন আইনটিতে। এক বছরের পর মামলা দায়ের করলে সেই মামলা চলতো না। তবে নতুন আইনে এই বিধানটি বাতিল করা হয়েছে। এখন যৌতুক আইনে মামলা করতে বাধা ধরা কোন সময় নেই।  

যদিও যৌতুক আইনে নারী পুরুষের বিরুদ্ধে এবং পুরুষ নারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে তবুও দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরাই পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে পুরুষকে হয়রানি করে থাকে। তবে মিথ্যা মামলা করার বিষয়টি প্রমাণিত হলে বর্তমানে আইনেই মিথ্যা মামলা দায়ের কারীর বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ নেয়া যাবে যেটি পুরুষের জন্য কিছুটা হলেও সহায়ক হবে।

সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

মিথ্যা মামলায় সত্যি স্বাক্ষী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। বাংলাদেশে যিনি বিচার বিভাগের প্রধান, সংবিধানের ৯৪(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক তিনিই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান যিনি সুপ্রীম কোর্টের প্রশাসনিক প্রধানতো বটেই, অধিকন্তু তিনি তৃতীয় শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত থেকে এ্যাপিলেট ডিভিশন অবদি সর্ব বিষয়ে বিচারিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা রাখেন। বিচারের দিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে তিনিই সর্বময় ক্ষমতায় অধিকারী। তবে দেশে চলমান বিচার ব্যবস্থায় আইন ও বিচার সমভাবে প্রয়োগ (APPLY)  হচ্ছে কিনা তার খবর প্রধান বিচারপতি কতটুকু রাখেন? 

অ্যাড. তৈমূর আলম খন্দকার। ছবি: সংগৃহিত
সত্য মিথ্যা যাচাইপূর্বক সত্যকে সমর্থন করাটাই বিচার বিভাগের কাজ। আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে বিচারিক কাজে পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। পুলিশের কাজটি কি? আইনকে সচল রাখা অর্থাৎ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কেহ আইনের ব্যপ্তয় ঘটালে তাকে দেশের প্রচলিত আইন মোতাবেক আদালতের সামনে বিচারের জন্য পেশ করা। তদন্তের কাজটিও পুলিশের উপর বর্তায়। ফৌজদারী কার্য বিধিতে মোকদ্দমা তদন্ত করার জন্য ১৫৪ ধারা থেকে ১৭৬ ধারা পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আইনের পরিভাষায় পুলিশ INQURY I INVESTIGATION  যাহাই করুক না কেন সত্যকে খুজে বের করাই তাদের প্রধান কাজ। কিন্তু কার্যত: মিথ্যা দিয়ে শুরু হয় পুলিশের যাত্রা যদি সেখানে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ থাকে। মামলা মোকদ্দমা রাষ্ট্রের একটি UNPRODUCTIVE খাত যা থেকে খরচের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অপ্রতুল। তথাপি এ খাতকে বাচিয়ে রাখতে হয় সভ্যতা ও রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। 

রাষ্ট্র যদি একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হয় তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রতিপক্ষ জনগণ। কারণ জনগণের আশা আখাংকার প্রতিফলন ঘটাতে পারে এমন প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্র বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে না। এ কারণেই জনগণকে নিগৃত করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহ্নত হচ্ছে, সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক যাদের জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহ্নত হওয়ার কথা ছিল, তারাই জনগণের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে যে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।” এখন প্রশ্ন হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ জনগণের কতটুকু সেবা করে যাচ্ছেন? যদিও শুধুমাত্র জনগণ হলেই একটি রাষ্ট্র গঠিত হয় না। অন্যান্য উপাদানের মধ্যে “জনগণই” মূল উপাদান এবং সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। উক্ত অনুচ্ছেদ মোতাবেক “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।” উক্ত অনুচ্ছেদের (২) উপ-ধারায় আরো বলা হয়েছে যে, “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্যকোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যথখানি অসামজস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।” 



সংবিধানের বর্ণিত বিষয়গুলি যদি মিলিয়ে পড়া যায় তবে দেশের সর্বোচ্চ আইন “সংবিধান” যা দ্বারা শুধু জনগণের কর্তৃত্বের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। সংবিধান যদি জনগণের রক্ষা কবজ হয় তবে জনগণের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকার কেন আজ রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের দ্বারা পদলিত?

সমাজের অবস্থান বর্তমানে এ পর্যায়ে চলে গেছে যে, খুনি খুন করে আতœতৃপ্তির লাভ করবে, কিন্তু তাকে খুনী বলা যাবে না, যদি কেহ খুনীকে খুনী বলে তবে তার হয়রানীর শেষ হবে না। নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাস্তায় দাড়ানো যাবে না, চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করা যাবে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বললেই জনগণের অর্থে লালিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী অর্থাৎ আমলারা শুরু করে জনতার উপর গুলি বর্ষন। অধিকন্তু লাঠি চার্জ আর মিথ্যা মামলা তো আছেই। মিথ্যা মামলাই বর্তমানে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক জনগণকে হয়রানীর প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহ্নত হচ্ছে। পুলিশের বড় কর্তারা কল্পনাপ্রস্তুত এমন ভৌতিক এজাহার সৃষ্টি করে যা একজন অশিক্ষিত মানুষ বিশ্বাস না করলেও ভৌতিক এজাহারই আইন আদালতের নিকট দিল্লীর লাড্ডু হিসাবে সমাদৃত হয়।   

বাংলাদেশে অনেকগুলি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও আইন রয়েছে যাদের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব সরকারী দলের স্বার্থে উর্দ্ধে থেকে শুধু জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। আইন ও সংবিধান সে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের সুর্নিদিষ্ট ক্ষমতা ও অধিক্ষেত্র প্রদান করলেও সরকার তথা সরকার প্রধানের পদলোহন করে নিজ পোষ্ট পজিশনকে সযত্নে রক্ষা করাই তাদের একমাত্র দায়িত্ব বলে তারা মনে করে। দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হওয়া স্বত্বেও চিরাচরিত ভাবেই সরকারের মদদ যোগানোই তাদের কাজ। সরকারী দলের কোন দূর্নীতি তাদের চোখে পড়ে না। কারণ দুদক নিজেই একটি দূর্নীতি গ্রস্থ প্রতিষ্ঠান। কাগজ পত্র টেম্পারিং করে এরা মোকদ্দমা সৃষ্টি করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে চার্জশীট প্রদান করে। সেই চার্জশীটকেই আদালতে দিল্লীকা লাড্ডু মনে করে দেশপ্রেমিক মানুষদের চরিত্র হনন করে। ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার পিছনে দুদক বা সরকারের কোন মাথা ব্যাথা নাই। কাজ শুধু একটাই তা হলো সরকার বিরোধীদের নিধন করা। সিটি কর্পোরেশনের মশা নিধন দপ্তরের মতই বিরোধী দলকে নিধন করাই এখন প্রশাসন/পুলিশ ও দুদকের একমাত্র কাজ। নতুবা শেয়ার ক্যালেঙ্কারী, নিয়মিত প্রশ্নপত্র ক্যালেঙ্কারী, রিজার্ভ চুরি, ব্যাংক লোপাট প্রভৃতি ক্ষেত্রে দুদক হাত দেয় না কেন? কারণ হাত দিলে হাত পুড়ে যাবে। ফলে ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষের প্রতি মামলায় হাত বাড়ানোই দুদক নিরাপদ মনে করে। বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের গ্রেফতার ও রিমান্ডের নামে যে বাণিজ্য হয় তা নিয়েও কেহ কোন কথা বলে না। সরকারী দলের অঙ্গুলি নির্দেশে ভৌতিক এজাহারের কারণে গ্রামে গঞ্জের অনেক পরিবারের সন্তানেরা গ্রেফতার ও রিমান্ড বানিজ্যের অসহনীয় অত্যাচারে এলাকায় থাকতে না পেরে রাজধানীতে রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। এখবরও কেহ রাখে না। সব দূর্নীতির খোজ নেয়া দুদকের দায়িত্বে কি আসে না? 



যারা জনগণের বিভিন্ন কর্মের শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত তারাই জনগণের রক্ত মাংস এমনভাবে চুষে খাচ্ছে যার ফলে জনগণ হচ্ছে হাড্ডিসার, অন্যদিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা হচ্ছে আঙ্গুল ফুলে বটগাছ, তাদের আর্থিক সংগতি এ পর্যায়ে যে চাঁদের দেশের জমি বিক্রি হলেও তা ক্রয় করার ক্ষমতা সে সকল আমলাদের রয়েছে। আমলারা যদি নুন্যতম জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করতো তবে এ দেশের সাধারণ মানুষকে এতো হয়রানীর শিকার এবং বিরোধী দলকে সরকার এভাবে নিষ্পেষিত করতে পারতো না। 

পবিত্র কোরআন শরীফ এ সূরা বাকারায় (আয়াত-১৮) মহান আল্লাহপাক এক শ্রেণীর লোক সম্পর্কে বলেন যে, “এরা কানে শোনে না, চোখে দেখে না, কথাও বলতে পারে না, অতএব এসব লোক (সৎ পথে) ফিরে আসবে না।” প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী/কর্মকর্তাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে অন্ধ মুখ বধিরদের মত তারা জনগণের মৌলিক অধিকার ও জন্মগত অধিকার বা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে গুরুত্ব প্রদান না করে শুধু অন্ধ বধিরদের মতো ক্ষমতাসীনদের তাবেদারী করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা বলে যে, তারা শুধু ক্ষমতাসীনদের আদিষ্ট হয়ে কাজ করে। যদি তাই হয় তবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকার বুলি থাকে কোথায়? পুলিশ যে ভাবে জনগণের অধিকারকে হরন করছে তা বৃটিশ ও পাকিস্তানকেও হার মানিয়েছে। মামলা সৃজন করা, মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেয়া, মিথ্যা চার্জশীট এবং সে চার্জশীটে সাজা হওয়া বর্তমানে কোন বিষয়ই না। পুলিশের সৃজন করা আমরা জজ মিয়া নাটকের কথা শুনেছি। বিএনপি’র মহাসচিব সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ীতে আগুন দেয়া এবং স্বাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে সে মামলায় চার্জশীট এ দেশের পুলিশই দিয়েছে এবং ঐ মামলায় মহাসচিবের সাজা হলেও আশ্চর্য হওয়ার কোন কারণ নাই। যেমনি ভাবে ঘসামাঝা কাগজের উপর ভিত্তি করে ০৮/২/২০১৮ সনে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ৫(পাঁচ) বৎসর সাজা দেয়া হয়েছে। কারণ মিথ্যার উপরই ভাসছে দেশ ও জাতি, সে অবস্থায় আইন আদালত এর উর্দ্ধে থাকবে কি ভাবে? 

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি যিনি বিচার সম্পর্কিত সব বিষয় খুটিয়ে খুটিয়ে দেখা দরকার, তিনিও তা দেখেন না বা দেখার ফুসরত (সময়) নাই, এর কারণ কি? তারা কি এটাকে দায়িত্ব বলে মনে করেন না? বিচারপতি এস.কে সিনহা মুর্তি স্থাপন সহ অনেক বির্তকের জন্ম দিলেও “নিন্ম আদালত বলতে আইন মন্ত্রণালয়” প্রকাশ্যে মন্তব্য করে সত্যোর অবতারনা করেছেন, এ মন্তব্যে অনেক বোবা কান্না, আর্তনাদ ও বুকফাটা কান্নার বহি: প্রাকশ ঘটেছে। আইন/আদালতের সরকারী তাবেদারীতে যারা নির্যাতিত/নিপীড়িত তারা আত্মতৃপ্তি লাভ করেছে।  



পুলিশ যে ভাবে গণমানুষের অধিকারকে হরন করে, নিন্ম আদালতগুলিও পুলিশের ভাষায়ই কথা বলে। নিন্ম আদালত সত্য মিথ্যা যাচাই করে না। বিচারিক সিদ্ধান্ত দেয়ার প্রশ্নে আদালত সরকারের মূখের দিকে চেয়ে থাকে। সরকার অসন্তুষ্ট হতে পারে, এমন কোন সিদ্ধান্ত নিন্ম আদালত দেয় না। ব্যারিষ্টার রফিকুল হকের মতে “এ দেশে হাওয়া বুঝে রায় হয়” কারণ তারা নাকি স্বাধীন নয়। যে নিজেকে পরাধীন মনে করে শত আইন পাশ করেও তাকে স্বাধীন বানানো যাবে না। 

সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব খায়রুল হক, বিচারপতি এস.কে সিনহার একটি রায় নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে “বিচারিক প্রজাতন্ত্র” হিসাবে মন্তব্য করেছেন। এমতাবস্থায়, এ দেশকে “পুলিশী প্রজাতন্ত্র” বললে কি ভুল করা হবে? পুলিশ বিরোধী দলীয় রাজনৈতিকদের “নাশকতাকারী” “দুষ্ণৃকিতিকারী” ও “সন্ত্রাসী” বলে সম্মোধন করে। পুলিশ যখন ভৌতিক ঘটনা দেখিয়ে মিথ্যা এজাহার ও চার্জশীট প্রদান করে তখন তাদের কি বলে সম্বোধন করা যায়? এখানেও সত্য বলা যাবে না, কারণ কাউকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করায় পুলিশকে জবাবদিহি করতে হয় নাই কোন দিন। কারণ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে গঠিত সকল বাহিনী সরকারের লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহ্নত হয় বলে আইন ও সংবিধানের চেয়ে তাদের হাত অনেক লম্বা। ফলে রাজনীতি ও গণতন্ত্র তাদের বুটের তলায়। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে না বরং শাসন কর্তাদের অভিলাষপূর্ণ করে যাদের হাতে বাহিনীগুলির প্রমোশন ও লোভনীয় পদে পোষ্টি দেয়ার ক্ষমতা।    


পোস্টটি লিখেছেন- তৈমূর আলম খন্দকার, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।   
সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা- অদ্ভুত কিন্তু সত্য (১ম পর্ব)

অনেক সময় আমরা রূপকথার কাহিনী শুনি। অদ্ভুত সব ঘটনা শুনি আর অবাক হই। ভাওয়াল সন্নাসী মামলার কাহিনী যেন রূপকথার কাহিনীকেও হার মানায়। এই মামলার কাহিনী অদ্ভুতুড়ে হলেও সত্য। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই কাহিনী আমাদের বাংলাদেশের কাহিনী।  যে কাহিনী সারা বিশ্বকে সেই সময় অবাক করে দিয়েছিল। আজও সেই কাহিনী পড়লে যেন মনে হয় রূপকথার কোন কাহিনী পড়ছি।শুধু তাই নয় ফরেনসিক বিজ্ঞানের জন্য এই মামলাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলাতে মানুষের পরিচয় বের করার কলাকৌশলের যথেষ্ট প্রয়োগ ঘটেছে।  ঘটনাটি গাজীপুরের ভাওয়াল এস্টেটকে কেন্দ্র করে। এক ব্যক্তি মারা যাওয়ার দশ বছর পর সেই ব্যক্তি হটাৎ সন্ন্যাসবেশ ধারণ করে দৃশ্যপটে হাজির হন। শুরু হয় নিজেকে জীবিত প্রমাণ করার লড়াই। সম্পত্তির হিস্যা পাওয়ার লড়াই। শুরু হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। পরিশেষে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। লাখ লাখ মানুষের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই মামলা। ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ভাওয়াল এস্টেট ও ভাওয়াল রাজবাড়ি। তাই কাহিনী শুরু করার আগে ভাওয়াল রাজবাড়ি ও ভাওয়াল এস্টেট সম্পর্কে জানলে কাহিনীটি আরো বেশি আকর্ষণীয় হবে।


ভাওয়াল রাজবাড়ী অবিভক্ত ভারতবর্ষের বাংলা প্রদেশের ভাওয়াল এস্টেটে, বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুর জেলায় অবস্থিত একটি রাজবাড়ী।বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত সন্ন্যাসী রাজা নামের বাংলা ছবিটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল যার ঘটনা এই রাজবাড়িকেই ঘিরে। এই রাজবাড়ীর আওতায় ভাওয়াল এস্টেট প্রায় ৫৭৯ বর্গমাইল (১,৫০০ কিমি২) এলাকা জুড়ে ছিল যেখানে প্রায় ৫ লাখ প্রজা বাস করতো। ভাওয়ালের জমিদার বংশের রাজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় ও আরো দুই ভাই মিলে এই জমিদারীর দেখাশোনা করতেন।

ভাওয়াল এস্টেট পরিধি এবং আয়ের দিক থেকে পূর্ব বাংলায় নওয়াব এস্টেটের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি। ভাওয়াল জমিদার বংশের পূর্বপুরুষগণ মুন্সিগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা যায়। এই বংশের জনৈক বলরাম সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে ভাওয়াল পরগনার জমিদার দৌলত গাজীর দীউয়ান হিসেবে কাজ করতেন। বলরাম এবং তার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ তৎকালীন বাংলার দীউয়ান মুর্শিদকুলী খানের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন এবং কৌশলে গাজীদের বঞ্চিত করে জমিদারি হস্তগত করেন।



রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে মুর্শিদকুলী খান বহু মুসলমান জমিদারকে বিতাড়িত করে তদ্‌স্থলে হিন্দু জমিদার নিযুক্ত করেন। ভাওয়ালের গাজীগণ মুর্শিদকুলী খানের এই নীতির কারণে জমিদারি স্বত্ব হারান। ১৭০৪ সালে শ্রীকৃষ্ণকে ভাওয়ালের জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে এই পরিবারটি ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে এই জমিদারির অধিকারী ছিলেন। শিকারী বেশে রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর পরবর্তী সময়ে ভাওয়াল পরিবার বহু ছোটোখাটো জমিদারি বা জমি ক্রয় করে একটি বিরাট জমিদারির মালিক হয়। ১৮৫১ সালে পরিবারটি নীলকর জেমস ওয়াইজ এর জমিদারি ক্রয় করে। এই ক্রয়ের মাধ্যমে পরিবারটি সম্পূর্ণ ভাওয়াল পরগনার মালিক হয়ে যায়। সরকারি রাজস্ব নথিপত্র থেকে এটি জানা যায় যে, ভাওয়ালের জমিদার ৪,৪৬,০০০ টাকা দিয়ে ওয়াইজের জমিদারি ক্রয় করেন, যা ছিল সে যুগের মূল্যমানের বিচারে বেশ বড় একটি অঙ্ক। ১৮৭৮ সালে এই পরিবারের জমিদার কালীনারায়ণ রায় চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বংশানুক্রমিক ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। কালীনারায়ণের পুত্র রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী এই জমিদারির আরও বিস্তৃতি ঘটান। এই সময়ই ভাওয়াল জমিদারি ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ জেলায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিতে পরিবর্তিত হয়। উল্লেখ্য যে, যদিও ঢাকার নওয়াব এস্টেটটি পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলাসমূহে জমিদারি বিস্তৃত করেছিল এবং জমিদারির প্রশাসনিক কেন্দ্র ঢাকা শহরেই অবস্থিত ছিল, কিন্তু ঢাকা শহরের অংশবিশেষ ও আশপাশের প্রায় সকল জমির মালিক ছিলেন ভাওয়াল রাজা। ১৯১৭ সালে ভূমি জরিপ ও বন্দোবস্ত রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ভাওয়াল পরিবারটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ২২৭৪টি মৌজায় ৪,৫৯,১৬৩.৩ একর জমির মালিক ছিলেন। ১৯০৪ সালে জমিদারিটি সরকারকে ৮৩,০৫২ টাকা রাজস্ব হিসেবে প্রদান করে এবং সকল খরচ-খরচা বাদ দিয়ে ৪,৬২,০৯৬ টাকা নিট আয় করে।


ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার পরে জমিদারির উত্তরাধিকারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে এবং ফলে এর ব্যবস্থাপনা ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনেই থেকে যায়। যেহেতু উত্তরাধিকারী নিয়ে বহু জটিলতা ছিল এবং জমিদারি সংক্রান্ত বহু মামলাও অমীমাংসিত ছিল, সে কারণে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণার পরেও এর বিষয়-সম্পত্তি বা দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে বণ্টন করা সম্ভব হয় নি। ফলে পাকিস্তান আমলেও জমিদারিটি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনেই থাকে। বর্তমানে ভাওয়াল এস্টেটের কর্মকাণ্ড গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ভূমি সংস্কার বোর্ড পরিচালনা করে।

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা

রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি তিন পুত্র যথাক্রমে রণেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি, রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি ও রবীন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি এবং তিন কন্যা যথাক্রমে ইন্দুময়ী দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী এবং তড়িম্ময়ী দেবীকে রেখে ১৯০১ সালের ২৬ এপ্রিল মৃত্যু বরণ করেন। রাজ কুমারগণ নাবালক থাকায় তাঁদের মা রাণী বিলাসমণি দেবী ট্রাস্টি হিসেবে এস্টেটের পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। ১৯০৭ সালে রাণী বিলাসমণির মৃত্যুর পর তিন ভ্রাতা সমান হিস্যায় জমিদারির মালিকানা স্বত্ব লাভ করেন। রাজকুমারগণ ছিলেন মুর্খ, মদ্যপ ও অমিতাচারী। খারাপ মেয়েছেলেদের সংসর্গে থাকার কারণে মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। ঘরে তাঁর স্ত্রী বিভাবতী দেবী থাকা সত্ত্বেও বেশ্যালয়ে গমন থেকে বিরত থাকেননি। স্থানীয় পর্যায়ে ও কোলকাতায় চিকিৎসা গ্রহণের পরও রোগমুক্ত না হওয়ায় শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও রাজ পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক ডাঃ আশুতোষ দাসগুপ্তের পরামর্শে ভ্রমণ, হাওয়া বদল ও চিকিৎসা লাভের উদ্দেশ্যে ১৯০৯ সালের ১৮ এপ্রিল স্ত্রী বিভাবতী দেবী, শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, পারিবারিক চিকিৎসক ডাঃ আশুতোষ দাসগুপ্ত, কুমারের প্রাইভেট সেক্রেটারি মুকুন্দ গুঁই, আরদালি শরীফ খাঁ পাঠান, গুর্খাগার্ড হরিসিংহ, হিসাব রক্ষক বীরেন্দ্র ব্যানার্জীসহ ২৭ জনের এক লটবহর নিয়ে মেজোকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে জয়দেবপুর ত্যাগ করেন। দার্জিলিং-এ শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ ও প্রাইভেট সেক্রেটারি মুকুন্দগুঁই কর্তৃক পূর্বেই ভাড়া করা ২০১, রণজিত রোডের স্টেপএসাইড নামক বাড়িতে লটবহর নিয়ে উঠলেন রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরি। এখানেই শুরু হলো ধুরন্ধর সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর ষড়যন্ত্র। তাকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এলো ডাঃ আশুতোষ দাস গুপ্ত।

রমেন্দ্র নারায়ণ সিফিলিসের রুগী হলেও শারীরিক ভাবে সুস্থই ছিলেন। ক’দিন আগে একটি মানুষ খেকো বাঘ শিকার করে কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। হঠাৎ ৫ মে তাঁর পেট ফুলে উঠলো। শুরু হলো পেটে ব্যাথা। ঘুম থেকে ডেকে উঠানো হলো ডাঃ আশুতোষকে। ডাঃ আশুতোষ মেজোকুমারের পেট পরীক্ষা করলেন, কিন্তু কোন ঔষধ দিলেন না। ৬ মে সকালে দার্জিলিং এর সিভিল সার্জন ইংরেজ ডাঃ টেলফার কেলভার্টকে ডাকা হলো। তিনি পেট ফাঁপা রোগের চিকিৎসা করলেন। দার্জিলিং হতে বড়কুমারের নিকট জয়দেবপুরে প্রেরিত দুই/ তিনটি টেলিগ্রামে দেখা যায় রমেন্দ্র নারায়ণের পেট ব্যথা সেরে উঠেছে, জ্বরও নেই। ৭ মে রাতে ডাঃ আশুতোষ দাসগুপ্ত দার্জিলং এর সিভিল সার্জনের সাথে আলোচনা না করে নিজে তিন বার করে খাওয়ানোর জন্য ঔষধের ব্যবস্থাপত্র দিলেন। ৮ তারিখ সকালে এবং দুপুরে টেলিগ্রাম করে জয়দেবপুরে বড়কুমার রণেন্দ্র নারায়ণকে জানানো হলো গত রাতে কুমারের সুনিদ্রা হয়েছে, জ্বর বা ব্যথা নেই। অথচ বিকেলে টেলিগ্রাম করে বড়কুমারকে জানানো হলো, ’কুমার ইস সিরিয়াসলি ইল, ফ্রি কোয়েন্টলি ওয়াটারি মোসানস উইথ ব্লাড, কাম সার্প’। বড়কুমারকে এমন সময়ে দার্জিলিংএ যেতে বলা হলো যখন ঐ দিনে যাতায়াতের আর কোন ট্রেন নেই টেলিগ্রামগুলো সুকৌশলে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে সত্যেন্দ্রনাথ ও ডাঃ আশুতোষ কর্তৃক প্রাইভেট সেক্রেটারি মুকুন্দগুঁইয়ের বরাত দিয়ে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে রমেন্দ্র নারায়ণের শারীরিক অবস্থা অবনতির শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। দার্জিলিং এর সিভিল সার্জন ডাঃ কেলভার্ট এবং সরকারি ডাঃ নিবারণ চন্দ্র এসে চিকিৎসা করলেন। মরফিন ইনজেকশনও দেয়া হলো। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। রাত ৮টার দিকে কুমারের শরীর ধীরে ধীরে হিম শীতল হয়ে গেল। রাত ৮.৩০ টার দিকে জয়দেবপুরে টেলিগ্রাম করে মেজোকুমারের মৃত্যুর সংবাদ জানানো হলো।



ঐদিন রাতে রমেন্দ্র নারায়ণের শবদেহ পোড়ানোর পুরোহিত ও শ্মশান যাত্রী জোগাড় করে দার্জিলিং এর পুরাতন শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলো। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে মুখাগ্নি দেয়ার মতো কেহ উপস্থিত না থাকলে বিধবা স্ত্রী মুখাগ্নি করবে। কিন্তু মুখাগ্নির জন্য বিভাবতীকে সংগে নেয়া হলো না। মৃতদেহ পোড়ানোর উদ্দেশ্যে চিতা সাজানোর জন্য একটি ভালো জায়গা খোঁজা হচ্ছিল। এর মধ্যে শুরু হলো প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি। শ্মশান যাত্রীরা বৃষ্টির পানিতে ভিজে একাকার। একটু আশ্রয় নেয়ার জন্য মুখাগ্নির পর শবদেহ শ্মশানে রেখে তারা দৌঁড়ে চলে গেল অন্যত্র। ঝড়-বৃষ্টি কমে গেলে শ্মশান যাত্রীরা এসে আর মৃতদেহ পায়নি। মৃতদেহ খোঁজা শুরু হলো। না পেয়ে শ্মশান যাত্রীরা ফিরে গেল যার যার আস্তানায়। এ দিকে সত্যেন্দ্রনাথ এবং ডাঃ আশুতোষ শুরু করলো আরেক ষড়যন্ত্র। তারা সেই রাতে অর্থের বিনিময়ে জোগাড় করলো একটি মৃতদেহ। মৃতদেহটি খাটিয়ায় রেখে সাদা কাপড়ে আবৃত করে রাখা হলো। এর পর ৯ মে সকালে পার্শ্ববর্তী পরিচিত ও অপরিচিত লোকজনকে খবর দেয়া হলো। শবদেহ পোড়ানো ও বহনের জন্য অর্থের বিনিময়ে লোক জোগাড় করা হলো। কৌশলে পরিচিত কাউকে মৃতদেহ হতে কাপড় সরিয়ে দেখতে দেয়া হলো না। অতঃপর সকাল ৮টার দিক মৃতদেহ দার্জিলিং শ্মশানে নিয়ে দাহ করা হলো। পরিশেষে ১০ মে মধ্যরাতে মেজো কুমারের বিধবা স্ত্রী বিভাবতী দেবী, ডাঃ আশুতোষ দাসগুপ্ত, শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীসহ সংগীয় অন্যান্য কর্মচারীরা ফিরে এলো জয়দেবপুর।

আরদালি শরীফ খাঁ মেজোকুমারকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতো। সে ছিলো বিশ্বস্ত ভৃত্য। রমেন্দ্র নারায়ণের মৃত্যুতে সে শোকে উম্মাদ। শরীফ খাঁ রাণী সত্যভামাকে জানায় যে, সত্যেন্দ্র নাথের উপস্থিতিতে ডাঃ আশুতোষ ছোট একটি কাঁচের গ্লাসে করে ঔষধ খাওয়ালেন। অসুস্থ মেজোকুমার কিছুটা ঔষধ খেতে পারলেন, কিছুটা উগরিয়ে ফেলে দিলেন। ঔষধ খাওয়ার পর মেজোকুমার চিৎকার করে বললেন আশু, তুমি আমায় কি খাওয়ালে? ঔষধের কিছু অংশ তাঁর কাপড়ে পড়ে কাপড় পুড়ে গিয়েছিল, কিছুটা থুথু বা লালা তাঁর ডান উরুতে লেগে ঘা হয়ে গিয়েছে। শরীফ খাঁ এসব দেখালো। অনেকেই এ কথা শুনতে পেল। জ্যোতির্ময়ী দেবী শরীফ খাঁ ও বীরেন্দ্র ব্যানার্জীকে ডেকে শুনতে পেল কুমারের দেহ দাহ হয়নি। খবরটি রটে গেল চারিদিকে। অনেকেরই বিশ্বাস জন্মালো রমেন্দ্র নারায়ণের মৃতদেহ শ্মশান থেকে উধাও হয়ে গেছে এবং দাহ হয়নি। তাদের এও বিশ্বাস জন্মালো যে, কুমার মরে নাই, বেঁচে আছে। বিভাবতী দেবীর ভ্রাতা সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ডাক্তারি সনদ, শবদেহ দাহ করার প্রত্যয়ন পত্রসহ কয়েক জনের মৌখিক বক্তব্য দিয়ে বিশ্বাস জন্মাতে প্রয়াস পায় যে, মেজোকুমারের মৃতদেহ উধাও হয়নি; বরং যথারীতি পুড়িয়ে ফেলানো হয়েছে। এগার দিন পর মেজোকুমারের শ্রাদ্ধের দিন জ্যোতির্ময়ী দেবী, রাণী সত্যভামা দেবীসহ আরো অনেকে বেঁকে বসলেন যে, মৃতদেহ দাহিত না হলে শ্রাদ্ধ করা যায় না। শেষ পর্যন্ত ঘাস দিয়ে মেজোকুমারের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে দাহ করে শ্রাদ্ধের কাজ সম্পন্ন করা হয়। জ্যোতির্ময়ী দেবী এবং রাণী সত্যভামার সন্দেহ থাকার কারণে তাঁরা সম্ভব্যস্থানে মেজোকুমারের খোঁজ নিতে লোক পাঠিয়ে দেন। এ দিকে সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকায় বাড়ি ভাড়া করে তাঁর মাকে নিয়ে এলেন। তারপর মায়ের দোহাই দিয়ে জয়দেবপুর থেকে বিভাবতীকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। 

বিভাবতীর অভিভাবক হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ মেজোকুমারের ইন্সুরেন্সের ৩০ হাজার টাকা তুলে নিলেন। আর জমিদারির এক তৃতীয়াংশের আয়ও গ্রহণ করলেন। ইন্সুরেন্সের টাকায় কোলকাতার ১৯নং ল্যান্স ডাউন রোডে নিজ নামে বাড়ি খরিদ করলেন এবং সেই সাথে দুটো গাড়িও। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য সে বাড়িতে উঠালেন বোন বিভাবতীকে। ব্রিটিস সরকার কোর্ট আব ওয়ার্ডস আইনের আওতায় ভাওয়াল রাজ্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেও রাজকুমারের বিধবা পত্নিগণ নিয়মিতভাবে ভাতা ও লভ্যাংশ পেতেন। বিভাবতীর অংশ গ্রহণ করতেন সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। এক হিসেবে দেখা যায় ১৯০৯ সাল হতে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ভাওয়াল এস্টেট থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন ১৯ লক্ষ টাকা। অপর দিকে ভাওয়াল রাজ এস্টেটের এক তৃতীয়াংশ দেখভালের অভিভাবকত্ব হেতু ইংরেজ কর্মচারীদের সাথে উঠাবসার সুবাদে উপাধি গ্রহণ করেছেন রায় চৌধুরী। অর্থাৎ জমিদার সত্যেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী। ওদিকে জ্যেতির্ময়ী দেবী ও রাণী সত্যভামা দেবীর মত ভাওয়াল রাজ এস্টেটের প্রজাবৃন্দ বিশ্বাস করেন যে, মেজোকুমার বেঁচে আছেন এবং একদিন তিনি সন্ন্যাসী বেশে ভাওয়াল রাজ্যে ফিরে আসবেন। প্রকৃতপক্ষে ৮মে ১৯০৯ সালে রাতে দশ এগারটার সময়ে রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরির মৃতদেহ দাহ করার জন্য দার্জিলিং পুরাতন শ্মশানে নেয়ার পর শুরু হলো তুমুল ঝড় বৃষ্টি। সেখানে কোন আশ্রয় স্থল না থাকায় শবযাত্রীরা আশ্রয় লাভের আশায় শ্মশান ঘাট হতে দৌঁড়ে সরে গিয়েছিল।

আরো পড়ুন

ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা- অদ্ভুত কিন্তু সত্য (২য় পর্ব) 

তথ্য সুত্র : গাজীপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভূমি সংস্কার বোর্ড, উইকিপিডিয়া


পোস্টটি লিখেছেন-এডভোকেট আজাদী আকাশ।      

সুপ্রিয় পাঠক, পোস্টটি সম্পর্কে আপনার কোন মতামত থাকলে নিচে মন্তব্যের ঘরে জানাতে পারেন। এছাড়া আমাদের ব্লগে লিখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

যে কারণে বন্ধ করা যায়নি ভারতীয় টিভি চ্যানেল

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত এবং জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল গুলোর মধ্যে “স্টার জলসা, স্টার প্লাস এবং জি বাংলা” অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশী মা বোনদের নিকট ভারতীয় এই টিভি চ্যানেলগুলির সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই সিরিয়াল গুলিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা।

 ২০১৪ সনের আগস্ট মাসে দৈনিক খবরের কাগজের কিছু শিরোনাম তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। ০২/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় “পাখির প্রেমে প্রাণ বিসর্জন” শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয় যেখানে দাবি করা হয় পাখি ড্রেস না কিনে দেওয়ায় এক তরুণী আত্মহত্যা করেছে। ১০/০৮/২০১৪ ইং তারিখে অন্য একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় “স্টার জলসা দেখতে না পেরে আত্মহত্যা” শিরোনামে।  বিগত ০৪/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকায় “পাখি না পেয়ে  এবার আত্রাইয়ে স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা” শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। একই দিনে দৈনিক ভোরের কাগজের শিরোনাম ছিল “সরিষা বাড়িতে ভারতীয় টিভি চ্যানেল বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন” । ০৯/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকা “ভারতীয় সিরিয়াল দেখতে না দেওয়ায় সাভারে স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা” শিরোনামে খবর প্রকাশ করে।

এই সব খবর পড়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে ভারতীয় উক্ত তিনটি চ্যানেল বন্ধ ঘোষণা করার জন্য রীট পিটিশন ফাইল করেন। উক্ত রীট পিটিশনে তিনি দাবি করেন ভারতীয় এই সব চ্যানেলের পরিবেশক ও এজেন্টগণ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ৩ ধারা মোতাবেক সরকারের নিকট থেকে  কোন অনুমোদন না নিয়ে এই সকল টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করছে। এছাড়া তারা সরকারকে অর্থ প্রদান না করে ধারা ২২ ও ৩২ এর বিধানাবলী লঙ্ঘন করছে। পিটিশনার আরও দাবি করেন যে, ভারতীয়  এই সব টিভি চ্যানেল ১৯ ধারা বিধান লঙ্ঘন করে যে সকল প্রোগ্রাম সম্প্রচার করছে সেগুলি বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। তাদের সম্প্রচারিত প্রোগ্রাম দেখে বাংলাদেশি তরুণীরা আত্মহত্যা করছে। বিপথগামী হচ্ছে। সংসারে কলহ বাড়ছে। এত কিছু ঘটা সত্বেও সরকারীভাবে এই সব চ্যানেল বন্ধের কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ উক্ত রীটের প্রেক্ষিতে সরকার এবং অন্যান্য পক্ষগণের বিরুদ্ধে রূল জারী করেন।

সরকার পক্ষ এবং ডিগি জাদু ব্রডব্যান্ড লিঃ ও ন্যাশন ওয়াইড মিডিয়া লিঃ জবাবে বলেন তারা সরকরের অনুমোদন নিয়ে এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করে আইনগতভাবে “স্টার জলসা, স্টার প্লাস এবং জি বাংলা” সম্প্রচার করছে। তারা দাবি করেন যে, এইসব চ্যানেলে এমন কোন প্রোগ্রাম সম্প্রচার করা হচ্ছে না যা বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানে। বরং এইসব চ্যানেলগুলি ভাল ভাল প্রোগ্রাম সম্প্রচার করছে বলেই দিন দিন এইসব চ্যানেল সবার নিকট জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সকল পক্ষকে শোনার পর গত ২৯/০১/২০১৭ ইং তারিখের রায় ও আদেশ দ্বারা রুল খারিজ করে দেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ধারা ১৫, ১৮, ১৯, ২৮ ও ২৯ বিশ্লেষণ করে রূলটি খারিজ করেন।

এখন দেখা যাক “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ধারা ১৫, ১৮, ১৯, ২৮ ও ২৯ এ কি আছে।

অনুমোদিত চ্যানেল সঞ্চালন বা সম্প্রচার স্থগিতকরণ, ইত্যাদি

১৫৷ (১) অনুমোদিত কোন চ্যানেল বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচারকালে যদি সরকারের নিকট এই মর্মে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান ধারা ১৯ এর পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার তাত্ক্ষণিক বা, ক্ষেত্রমত, যাচাইপূর্বক উক্ত চ্যানেলের বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচার সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারিবে৷ 
(২) স্থায়ীভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়া কোন চ্যানেলের বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচার উক্ত চ্যানেলের ডিসট্রিবিউটরের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার উপযুক্ত মনে করিলে, নির্ধারিত ফি পরিশোধ সাপেক্ষে, পুণরায় চালু করিবার নির্দেশ দিতে পারিবে৷

গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি

১৮৷ (১) এই আইনের অধীন সেবাপ্রদানকারী কর্তৃক প্রদত্ত সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কোন অভিযোগ থাকিলে উহা সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিতভাবে পেশ করা যাইবে৷

(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন অভিযোগ প্রাপ্তির পর লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ উহার যথার্থতা যাচাইপূর্বক সেবাপ্রদানকারীকে তদ্‌বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি অনধিক ৭ (সাত) দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারিবে এবং নির্দেশ পালনের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ উহার লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িকভাবে স্থগিত করিতে পারিবে৷

সম্প্রচার বা সঞ্চালনের ক্ষেত্রে বাধা-নিষেধ


১৯৷ সেবাপ্রদানকারী কেব্‌ল্‌ টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যেসব অনুষ্ঠান সম্প্রচার বা সঞ্চালন করিতে পারিবে না তাহা নিম্নরূপ, যথাঃ-

(১) দেশের অখন্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আর্দশের পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(২) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৩) হিংসাত্মক, সন্ত্রাস, বিদ্বেষ ও অপরাধসম্বলিত কোন অনুষ্ঠান;

(৪) বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৫) জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ হানিকর কোন অনুষ্ঠান;

(৬) দেশের কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর আবেগ অনুভূতিতে আঘাত হানিতে পারে এমন কোন অনুষ্ঠান;

(৭) The Censorship of Films Act, 1963 (Act No. XVIII of 1963) বা উহার অধীন প্রণীত বিধি বা নীতিমালার পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৮) অশালীন বা আক্রমণাত্মক কোন রসিকতা, অঙ্গভঙ্গী, নৃত্যগীত, বিজ্ঞাপন, সংলাপ বা সাবটাইটেল সম্বলিত কোন অনুষ্ঠান;

(৯) নগ্নতা, নগ্ন ছায়াছবি, বস্ত্র উম্মোচন দৃশ্য, দেহ প্রদর্শন, অশোভন অংগভঙ্গী, যৌনক্রিয়ার ইংগিত সূচক বা প্রতীকী নাচ অথবা অশোভন দৃশ্যাবলী সম্বলিত এমন কোন অশ্লীল অনুষ্ঠান;

(১০) উচ্ছৃংখলতা, ধ্বংসযজ্ঞ, শিশু-কিশোর অপরাধ বা অপ-সংস্কৃতিকে আর্কষণীয় ও উত্সাহিত করিতে পারে বা শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ক্ষতির কারণ হইতে পারে এমন কোন অনুষ্ঠান;

(১১) মূল তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন না রাখিয়া সম্প্রচারিত এমন কোন অনুষ্ঠান;

(১২) অন্য কোন আইন দ্বারা বারিত বা সেন্সরকৃত ছায়াছবি বা কোন অশ্লীল অনুষ্ঠান;

(১৩) বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশী কোন চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন;

(১৪) সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের দর্শকদের উদ্দেশ্যে বিদেশী চ্যানেলের কোন অনুষ্ঠান সম্প্রচার৷

শাস্তি

২৮৷ (১) এই আইনের অধীন ধারা ৩, ৪, ৭(৩) ও (৪), ১৬, ১৭(২), ১৭(৩), ১৭(৫), ১৯, ২১, ২২, ২৩, ও ২৫ এর কোন বিধান লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ৷

(২) যদি কোন ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ২ (দুই) বত্সর সশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ১(এক) লক্ষ টাকা কিন্তু অন্যুন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং অপরাধ পূনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বত্সর সশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ২ (দুই) লক্ষ্য টাকা কিন্তু অন্যুন ১(এক) লক্ষ্য টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন৷

(৩) এই আইনের অন্যান্য বিধান সাপেক্ষে, বিধি দ্বারা কতিপয় অপরাধ চিহ্নিত এবং উক্ত অপরাধ সংঘটনের জন্য দণ্ড নির্ধারণ করা যাইবে, তবে এইরূপ দণ্ড ১ (এক) বত্সর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের অতিরিক্ত হইবে না৷

অপরাধের বিচার

২৯৷ Code of Criminal Procedure, 1898 (Act No. V of 1898) বা অন্য আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনে বর্ণিত সকল অপরাধ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটান এলাকায় মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য হইবে৷

উক্ত আইনের বিধান মতে সরকার, লাইসেন্সিং অথরিটি এবং কোর্ট কোন টিভি চ্যানেল বন্ধের ক্ষমতা রাখে। রীটের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয় তাহলো যদি অন্য কোথাও কোন প্রতিকার ্পাওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে সেই সুযোগ গ্রহণ না করে হাইকোর্টে রীট ফাইল করা যাবে না। আমরা যে রীটের বিষয়টি আলোচনা করেছি সেখানে রীটকারী পত্রিকার খবর পড়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট ফাইল করেছেন। অথচ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ১৫ ও ১৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, যদি কোন টিভি চ্যানেল সম্পর্কে কারও অভিযোগ থাকে তাহলে উক্ত টিভি চ্যানেল সম্পর্কে সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটির নিকট অভিযোগ করতে হবে। সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটি উক্ত অভিযোগ তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটির নিকট কোন অভিযোগ না করে সরাসরি রীট করাই উক্ত রীট  পিটিশনটি খারিজ করা হয়েছে। রীটকারী আইনজীবীর উচিত ছিল প্রথমে সংশ্লিষ্ট অথরিটির নিকট আবেদন করা। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট অথরিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে তখন রীট ফাইল করার কারণ তৈরী হতো এবং ভাল একটা ফলাফল পাওয়া যেত। যেহেতু রীটটি খারিজ হয়েছে সেহেতু ভারতীয় এইসব টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে সম্প্রচার হতে আইনগতভাবে আর কোন বাধা রইলো না।


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!



আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

নির্বোধের মত নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারছেন না তো!

ফেসবুকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, দিন মজুর, কোটিপতি, ক্ষমতাধর, ক্ষমতাহীন, নির্বোধ, বুদ্ধিমানসহ সমাজের সর্বস্তরের লোকজন ফেসবুকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। কারণ ফেসবুক যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। হাজার হাজার মাইল দূরের বন্ধুদের সাথে আমরা ফেসবুকের মাধ্যমে সহজেই যোগাযোগ করতে পারছি। শুধু তাই নয়, অনেক হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকেও ফেসবুকে এসে আমরা খুঁজে বের করে ফেলছি। বছরের পর বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরও আমরা আমাদের পুরানো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হচ্ছি। এসবই ফেসবুকের অবদান। আমরা চাইলেও এসব অবদানকে অস্বীকার করতে পারি না। তবে সবকিছুর মত ফেসবুক ব্যবহারেরও কিছু মন্দ দিক আছে। আমরা যদি সেসব মন্দ বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে পারি তাহলে আমাদের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি পরবর্তী প্রজন্মও সেই পথে হেঁটে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।




আমরা কম বেশি যারা ফেসবুক ব্যবহার করি তারা সকলেই জানি সম্প্রতি বহুল আলোচিত সমালোচিত একটি আইন পাশ হয়েছে আমাদের জাতীয় সংসদে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর কথাই বলছি। এই আইনে এমন কিছু ধারা সন্নিবেশিত হয়েছে যেগুলো সম্পর্কে  সচেতন না হলে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক বা অর্থনৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমাদের পুরো পরিবারও শেষ হয়ে যেতে পারে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুক ব্যবহার করি। ফেসবুক ব্যবহার করতে গিয়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি যে, অনেকেই জেনে না জেনে ফেসবুকে  এমন সব শেয়ার, কমেন্টস, পোস্ট বা ছবি আপলোড করি যেটা আমাদের জীবনকে মূহুর্তেই ক্ষতিগ্রস্ত করে দিতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধিমান হয়েও আমরা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেই।


অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেকেই অপরের ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুকে আইডি খোলেন। এটা একটি অপরাধ। যিনি এরূপ অপরাধ করছেন তিনি হয়তো বা ভাবছেন আমার পরিচয় বা ঠিকানা তো ফেসবুকে নেই। তাহলে পুলিশ আমাকে ধরবে কিভাবে। কিন্তু আপনি হয়তো বা জানেন না প্রযুক্তি কতটা এগিয়ে গেছে। আপনি কোন ডিভাইস থেকে কখন ও কোথা থেকে এইসব ছবি আপলোড করছেন বা শেয়ার করছেন বা সর্বোপরি যে এ্যাকাউন্ট টি আপনি পরিচালনা করছেন সব তথ্যই আইন শৃ্ঙ্খলা বাহিনী মুহুর্তেই বের করতে সক্ষম। আপনি যে অন্যের পরিচয় দিয়ে বা ছবি ব্যবহার করে বা পুরুষ হয়েও মহিলার পরিচয় ধারণ করে অন্যের সাথে প্রতারণা করছেন তার জন্য আপনার শাস্তি হতে পারে। কারণ এটি একটি অপরাধ। সদ্য পাশ হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৪ ও ২৬ ধারায় এ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-

২৪। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, কোনো ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করিয়া-

(ক) প্রতারণা করিবার বা ঠকাইবার উদ্দেশ্যে অপর কোনো ব্যক্তির পরিচয় ধারণ করেন বা অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত কোনো তথ্য নিজের বলিয়া প্রদর্শন করেন, বা

(খ) উদ্দেশ্যমূলকভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তা নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্যে নিজের বলিয়া ধারণ করেন,-

(অ) নিজের বা অপর কোনো ব্যক্তির সুবিধা লাভ করা বা করাইয়া দেওয়া,

(আ) কোনো সম্পত্তি বা সম্পত্তির স্বার্থ প্রাপ্তি,

(ই) অপর কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিসত্তার রূপ ধারণ করিয়া কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিসত্তার ক্ষতিসাধন, 

তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫(পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।



(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।


২৬। (১) যদি কোনো ব্যক্তি আইনগত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে অপর কোনো ব্যক্তির পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, বিক্রয়, দখল, সরবরাহ বা ব্যবহার করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। 

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

ব্যাখ্যা।- এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, ‘‘পরিচিতি তথ্য’’ অর্থ কোনো বাহ্যিক, জৈবিক বা শারীরিক তথ্য বা অন্য কোনো তথ্য যাহা এককভাবে বা যৌথভাবে একজন ব্যক্তি বা সিস্টেমকে শনাক্ত করে, যাহার নাম, ছবি, ঠিকানা, জন্ম তারিখ, মাতার নাম, পিতার নাম, স্বাক্ষর, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নম্বর, ফিংগার প্রিন্ট, পাসপোর্ট নম্বর, ব্যাংক হিসাব নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ই-টিআইএন নম্বর, ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল স্বাক্ষর, ব্যবহারকারীর নাম, ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড নম্বর, ভয়েজ প্রিন্ট, রেটিনা ইমেজ, আইরেস ইমেজ, ডিএনএ প্রোফাইল, নিরাপত্তামূলক প্রশ্ন বা অন্য কোনো পরিচিতি যাহা প্রযুক্তির উৎকর্ষতার জন্য সহজলভ্য।


এছাড়া কোন কারণ ছাড়াই বা ব্যক্তিগত আক্রোশে অনেকেই ফেসবুকে অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা এবং মানহানিকর তথ্য প্রচার বা শেয়ার করেন যা রীতিমত অপরাধ। এর জন্যও অনেকে মামলায় জড়িয়ে যেতে পারেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারায় এ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-

২৯। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে Penal Code (Act XLV of 1860) এর section 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তজ্জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

এছাড়া অনেকেই ফেসবুক ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা সত্বেও সেসব তথ্য প্রচার করেন যা অপরাধ হিসেবে গণ্য। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় এ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-

২৫। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে,-

(ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা

(খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণু করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, 

তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।


আবার অনেকেই আছেন যারা ফেসবুকে এমন বিষয়
লেখেন বা শেয়ার করেন যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটার উপক্রম হয়। এই সব লেখা বা শেয়ার করাও হলো অপরাধ। এমন কিছু করলে নিশ্চিত মামলায় জড়াবেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩১ ধারায় এ সম্পর্কিত বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে-

৩১। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ। 

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

আমরা অনেকেই আছি যারা সচেতন বা অবচেতন ভাবেই এই সব বিষয়ে লিখি বা শেয়ার করি বা কমেন্টস করি। গালাগালি, অশ্লীল শব্দ ব্যবহার, ছবি ব্যবহার, অন্যের ছবি বিভিন্ন্ গ্রুপে পোস্ট করি বা শেয়ার করি। বুঝতেও পারি না এসব করে আমরা নির্বোধের মত নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মারছি।

সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

ফ্ল্যাট ক্রয় সংক্রান্ত সমস্যার আইনি সমাধান

সাধ্যের মধ্যে নিজের একটি বাড়ির সাধ কার না থাকে। কিন্তু ইট-কাঠের এই শহরে বাড়ি তৈরি করা বা কেনা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। বাড়ির জন্য যেমন চাই জমি, আবার জমি থাকলেই বাড়ি হয় না। তাই যাঁদের জমি নেই, তাঁদের জন্য সমাধান তৈরি ফ্ল্যাট; আর যাঁরা জমি থাকতেও বাড়ি করতে পারছেন না, তাঁদের মুশকিলের আসানকারী যেন ডেভেলপার। কিন্তু সাধ ও সাধ্যের মিলনে এখানেও বাধা।


অভিযোগ আছে, চুক্তি করার আগে ডেভেলপাররা ভূমির মালিককে রীতিমতো তেল মর্দন করলেও চুক্তির পর তার চিত্র ঠিক উল্টো। আবার ফ্রি অফার, নির্দিষ্ট সময়ে হস্তান্তর, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা—নানা ছলাকলার ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই জলের মধ্যে টাকা ফেলেন, অথচ বছরের পর বছর পার হলেও সেই জলও শোকায় না, ফ্ল্যাটেরও দেখা মেলে না। আশা তখন হতাশায় পরিণত হয়। তাই চুক্তি করার আগে কিংবা ফ্ল্যাট বা প্লট বুকিং দেওয়ার আগে কিছু বিষয় সবারই জানা দরকার। সমস্যা সমাধানকল্পে ২০১০ সালে প্রণীত রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইনেই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার নিবন্ধন ও তার দায়দায়িত্ব
ডেভেলপারের হাতে জমি তুলে দেওয়ার আগে আপনাকে জেনে নিতে হবে ডেভেলপার কোম্পানিটি নিবন্ধিত কি না। আইন অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যবসা করার জন্য রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারকে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এবং সারা দেশে ব্যবসা করার জন্য সরকারের কাছ থেকে নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। এই নিবন্ধন পাঁচ বছর পর পর নবায়নযোগ্য। নিবন্ধিত ডেভেলপারদের তালিকা যদি কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত থাকে সেখান থেকেই আপনি জেনে নিতে পারবেন। ডেভেলপারকে তাদের প্রসপেক্টাসে রিয়েল এস্টেটের নিবন্ধন নম্বরসহ নাম-ঠিকানা ও যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত নকশার নম্বরসহ স্মারক নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করতে হবে। কোনো ডেভেলপারই প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে পারবে না এবং ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো চুক্তি করতে পারবে না। প্লট কেনার আগে অবশ্যই আপনি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখে নেবেন এবং ডেভেলপার তা আপনাকে দেখাতে বাধ্য। প্রকল্পগুলো এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে করে অবকাঠামোগত যেমন: রাস্তাঘাট, বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, গ্যাস সংযোগ, টেলিফোন সংযোগ বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুবিধার কোনো ক্ষতি সাধন না হয়। কোনো ব্যক্তি নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করলে বা কোনো ডেভেলপার অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরু করলে বা বিজ্ঞাপন প্রচার করলে দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে চুক্তি 
রিয়েল এস্টেট উন্নয়নের লক্ষ্যে জমি হস্তান্তরের আগে মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদন করতে হয়। চুক্তিতে কে কত অংশ পাবে তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকতে হবে অর্থাৎ রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন বাবদ ডেভেলপারের পাওয়া অংশ ও জমির মালিকের অংশের পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। এ ছাড়া ডেভেলপারের পাওয়া অংশ ক্রেতা বরাবর দলিল সম্পাদন ও হস্তান্তরের ক্ষমতা প্রদানের উদ্দেশ্যে ডেভেলপার বরাবর আমমোক্তারনামা দলিল সম্পাদনসহ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু ও শেষ করার তারিখ উল্লেখ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমির মালিকের অংশ হস্তান্তর না করলে বা দখল বুঝিয়ে না দিলে ডেভেলপারের দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আবার ভূমির মালিক যদি চুক্তিতে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ডেভেলপারের কাছে জমির দখল হস্তান্তর না করে বা ডেভেলপার বরাবর সম্পাদিত আমমোক্তারনামা কোনো নোটিশ ছাড়াই বাতিল করে তবে সেও দণ্ডিত হবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রত্যেক ডেভেলপারকে রিয়েল এস্টেট হস্তান্তরের পর কমপক্ষে এক বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে এবং নির্মাণসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে মেরামতের প্রয়োজন হলে দুই বছর পর্যন্ত ডেভেলপার নিজ খরচে তা মেরামত করবে। হস্তান্তরের আগে অবশ্যই সব ধরনের ইউটিলিটি সার্ভিস যেমন: পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, অগ্নিনিরোধক-ব্যবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।

রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়, রেজিস্ট্রেশন, হস্তান্তর 
আপনাকে ফ্ল্যাট কিনতে হলে ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে এবং এ চুক্তিতে ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত বিস্তারিত শর্ত উল্লেখ থাকবে। চুক্তি বা বরাদ্দপত্রে ভবনে অবশ্যই যেসব ফিটিংস-ফিক্সার ইত্যাদি ব্যবহার করা হবে তার বিবরণ থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে কাঠামো নকশা যোগ্যতাসম্পন্ন লোক দ্বারা প্রণয়ন করা হয়েছে কি না, এবং প্রণয়নের সময় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। প্রণীত অনুমোদিত নকশা ডেভেলপার আপনাকে দিতে বাধ্য থাকবে। চুক্তির ভিত্তিতে ডেভেলপার আপনাকে পছন্দসই ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেবে এবং আপনার বিনা অনুমতিতে বরাদ্দ করা প্লট বা ফ্ল্যাট পরিবর্তন করতে পারবে না। চুক্তিতে উল্লিখিত শর্তের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে আপনি বাধ্য নন, তবে যদি কোনো উন্নতমানের সরঞ্জাম সংযোজনের দরকার হয়, তবে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া যেতে পারে। সমুদয় মূল্য পরিশোধের তিন মাসের মধ্যে ডেভেলপার আপনাকে দখল হস্তান্তর, দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশনের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে দেবে এবং হস্তান্তরকালে আয়তন কম-বেশি হলে তার মূল্য ক্রয়মূল্য অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। আপনাকে রিয়েল এস্টেটের মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে এককালীন বা কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে। আপনি এককালীন বা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধে ব্যর্থ হলে ডেভেলপার ৬০ দিনের আগে নোটিশ দিয়ে বরাদ্দ বাতিল করতে পারবে এবং এ ক্ষেত্রে ডেভেলপার আপনার জমা করা অর্থ পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে চেকের মাধ্যমে একসঙ্গে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে। তবে আপনি বিলম্বিত সময়ের জন্য কিস্তির অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে সুদ প্রদানসহকারে কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন তবে তা তিনবারের বেশি করতে পারবেন না। আবার ডেভেলপার নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থ হলে চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ সব অর্থ আপনাকে ছয় মাসের মধ্যে ফেরত দেবে, তবে চুক্তিতে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ না থাকলে তা পরিশোধিত অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে নির্ধারিত হবে। আবার আপনি কোনো কারণে বরাদ্দ বাতিল করতে চাইলে ডেভেলপার আপনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিশোধিত অর্থের ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে বাকি অর্থ তিন মাসের মধ্যে এককালীন চেক বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত দেবে।

বিরোধ ও বিচারপদ্ধতি
এই আইনের অধীন অপরাধগুলো আপসযোগ্য, জামিনযোগ্য ও অ-আমলযোগ্য এবং প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য। বিচারের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার করা হবে। তবে সম্পাদিত চুক্তির কোনো বিধান যেমন: নোটিশ ছাড়া বরাদ্দ বাতিল, প্রতিশ্রুত নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার না করা, অননুমোদিত নকশাবহির্ভূত নির্মাণ, অনুমতি ছাড়া রিয়েল এস্টেট বন্ধক রাখা ইত্যাদি লঙ্ঘনের জন্য মতবিরোধ দেখা দিলে পক্ষদয় প্রথমে নিজেদের মধ্যে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করবে এবং কোনো কারণে তা ব্যর্থ হলে বিষয়টি সালিস আইন-২০০১ মোতাবেক সালিসি ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে পক্ষগণ ট্রাইব্যুনাল গঠনে ব্যর্থ হলে যেকোনো পক্ষ বিবদমান বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবে। সব শেষে সাধ ও সাধ্য যখন একই বিন্দুতে মিলিত হয়, তখনই কেবল কাঙ্ক্ষিত সুখের নাগাল মেলে। তাই সাধ্যের মধ্যে বাড়ি তৈরি বা ফ্ল্যাট কিনে সবটুকু সুখ পেতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ডেভেলপার কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের কাজগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার। তাই উভয় পক্ষের সচেতনতা ও দায়িত্ব পালনের মধ্যদিয়ে যাতে মালিক বা ক্রেতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, সেই চেষ্টা করতে হবে।

তথ্যসুত্রঃ বাংলাদেশের আইন কানুন


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!

আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কে জানুন-নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন

দীর্ঘ আলোচনা সমালোচনার পর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ পাস হয়েছে। বিভিন্ন মহলের প্রস্তাব, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, সমালোচনা, দাবি-দাওয়া সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সরকার অবশেষে এই আইনটি পাস করেছে।অনেকে এই আইনটিকে কালো আইন হিসেবে গণ্য করছেন। কালো আইন বা সাদা আইন যে নামেই আইনটিকে নামকরণ করা হোক না কেন, আইনটি যেহেতু জাতীয় সংসদে পাস হয়ে গিয়েছে সেহেতু আমরা সবাই এখন এই আইনের অধীন। আইনের বিধি বিধান মানতে আমরা বাধ্য। এই আইনে এমন কিছু বিধান আছে যা না জানলে আপনার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ইতোপূর্বে যেসকল বিষয় আপনি নির্বিঘ্নে লিখতে পারতেন বা শেয়ার করতে পারতেন বা পোস্ট করতে পারতেন তা এখন আর করতে পারবেন না। এছাড়া এখানে আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও আইনটিতে কিছু বিধি বিধান সন্নিবেশিত করা হয়েছে। তাই আইনটি সম্পর্কে জেনে আপনার নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত করুন।


এই আইনের ৮ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ক্ষেত্রমত ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবেন।’

একই ধারায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় মহাপরিচালকের মাধ্যমে একইভাবে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা বন্টক করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আইনের এ ধারায় সরকারকে অবহিত করে বিটিআরসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত অনুরোধ কার্যকর করার সক্ষমতা দেয়া হয়েছে।


২১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের  চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদন্ড ও এক কোটি টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা তিন কোটি টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।’

২৫ নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যা আক্রমণাত্মক বা ভীতিপ্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয়প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি তিন বছরের কারাদন্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।


২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্যকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা মূল্যবোধে আঘাত করে, তাহলে তিনি ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকার অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদন্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

২৯ ধারায় বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্যকোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে প্যানাল  কোডের ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর কোনো তথ্য প্রচার বা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি ৩ বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

৩১ নং ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে তিনি ৭ বছরের কারাদন্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

৩২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি (অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট ১৯২৩-এর আওতাভুক্ত)  কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি ১৪ বছরের কারাদন্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন। যদি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হবেন।

৪৩ নং ধারায় পুলিশকে  গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, মালামাল জব্দ ও  গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের অনুমোদনক্রমে পুলিশ যে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি করতে পারবে এবং বাধাপ্রাপ্ত হলে  ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। 

কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ও  নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ও দলিলাদি জব্দ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে  গ্রেফতার করতে পারবে। তবে তল্লাশি সম্পন্ন করার পর এ বিষয়ে ট্রাইবুনালকে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এই আইনের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইবুনালের আদেশ অনুসারে এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটনে জড়িত কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ফল্পি ডিস্ক, কম্প্যাক্ট ডিস্ক,  টেপ-ড্রাইভ বা অন্য আনুষঙ্গিক উপকরণ বাজেয়াপ্ত হবে।

৫৫ ধারায় এই আইনের অধীনে সংঘটিত কোনো অপরাধের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রয়োজনে হলে ‘অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা আইন ২০১২-এর বিধানাবলি প্রজোয্য হবে।’

আইনের ৫৬ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালক প্রয়োজনবোধে এই আইনের বলে তার ওপর অর্পিত যে কোনো ক্ষমতা বা দায়িত্ব লিখিতভাবে এজেন্সির কোনো কর্মচারী এবং অন্যকোনো ব্যক্তি বা পুলিশ অফিসারকে অর্পণ করতে পারবেন। এই আইনের অধীনে কৃত সব কাজকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে।

এছাড়া ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড হতে পারে।

ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নগ্রাফি ও শিশু পর্নগ্রাফির অপরাধে সাত বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

কোন ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।

বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।

‘সরল বিশ্বাসকৃত কাজকর্ম’ শিরোনামে আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কাজের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।’


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে কি করবেন?

ক্যাম্পাসেই নাদিয়া আর রাহাতের পরিচয়, তারপর প্রেম। আসা হল পরষ্পরের আরো কাছাকছি। বছর দুই না যেতেই ভেঙ্গে গেল সম্পর্ক। ঘটনা এতটুকুতে শেষ হলে পারত। কিন্তু রাহাত তা হতে দিল না। ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন গ্রুপ আর ইউটিউবে ছড়িয়ে দিল নাদিয়ার সাথে তার অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি ও ভিডিও। যে ছিল হৃদয়ের দাবিদার আজ সে এক নির্মম বিভীষিকা। অপমানে লজ্জায় নাদিয়ার মনে হতে লাগল আত্মহননই বুঝি মুক্তির একমাত্র পথ।

প্রিয় সুধী, নাদিয়ার মত এমন ভুক্তভোগী বোন হয়তো আছে আমার আপনার আশেপাশেই। সোশাল মিডিয়ার এ যুগে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ, তথ্যের আদান প্রদান যেমন সহজতর হয়েছে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি/ভিডিও অপব্যবহার করে ব্লেকমেইলিংসহ নানান রকম হয়রানির পরিমাণ। কোন কোন ক্ষেত্রে ভিকটিম নিজেও জানছেন না তার তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে অপরাধী/অপরাধীরা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে আপত্তিকর মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট বা উগ্র ধর্মীয়/সন্ত্রাসবাদী ধ্যানধারণা। প্রতিকার চাওয়া তো দূরের কথা অনেক সময় সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশও করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। এ ধরণের সাইবার অপরাধের শিকার হতে পারেন যে কেউ। এমতাবস্থায় আপনার করণীয় কি? এমতাবস্থায় হয়রানীর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে নীচের পরামর্শগুলো মেনে চলুন।

কি ধরণের হয়রানির শিকার হতে পারেন


ফেসবুক বা ইমেইল একাউন্ট হ্যাক হওয়া, ফেক আইডি খুলে আপত্তিকর ছবি/ভিডিও শেয়ার, উগ্রধর্মীয়-সন্ত্রাসবাদী কনটেন্ট শেয়ার, অন্যকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে তার বিকৃত তথ্য ও ছবি ব্যবহার, হুমকি দিয়ে টাকা আদায়, অনলাইনে প্রশ্নফাঁস ইত্যাদি।

কোথায় অভিযোগ করবেন

০১। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ করতে পারেন আপনার নিকটস্থ থানায়। অথবা,

০২। ই-মেইলে অভিযোগ জানাতে পারেন cyberhelp@dmp.gov.bd এই ঠিকানায়। অথবা

০৩। যদি পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করতে চান তাহলে Google Play Store থেকে ডাউনলোড করুন ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশন এর Hello CT অ্যাপ। এ অ্যাপ ব্যবহার করে পাঠাতে পারবেন আপনার ব্যক্তিগত তথ্য। অথবা,

০৪। সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলে চলে আসতে পারেন ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের Cyber Crime Unit অফিসে। কথা বলতে পারেন দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে এই নাম্বারে-০১৭৬৯৬৯১৫২২ । ঠিকানাঃ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ৩৬ শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী স্মরণী, রমনা, ঢাকা।

কিভাবে অভিযোগ করবেন

ভিক্টিমাইজড হলে যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ জানানো উচিত। অভিযোগ করার ক্ষেত্রে আপনার অভিযোগের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণাদি প্রয়োজন। যেমন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলামতের স্ক্রীনশট, লিংক, অডিও/ভিডিও ফাইল অথবা রিলেটেড ডকুমেন্টস। স্ক্রীনশট সংগ্রহের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন Address Bar এর URL টি দৃশ্যমান হয়। Hello CT অ্যাপ ও ই-মেইল এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে চাইলে এসব কন্টেন্ট এটাচ করে আপলোড করতে পারেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে সরাসরি সফট কপি দেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি আপনি প্রয়োজনে Cyber Crime Unit এর অফিসারদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন যা আপনার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সহায়ক হতে পারে।

প্রতিরোধ আপনার হাতেই

একটু সচেতন হলেই আপনি এড়াতে পারেন এমন বিব্রতকর ঘটনা। জেনে নিন নিরাপদ থাকার কিছু কৌশলঃ

১। অচেনা, অপরিচিত কারো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট Accept করবেন না।

২। ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সবার জন্য উম্মুক্ত(Public) রাখবেন না।

৩। আপনার ফেসবুক প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস চেক করুন। অন্য কারো পোস্টে আপনাকে Tag করার অপশন উম্মুক্ত রাখবেন না।

৪। প্ররোচিত হয়ে উস্কানিমূলক ছবি/ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।

৫। সন্দেহজনক কোন লিংকে ক্লিক করবেন না।

৬। লগ-ইন আইডি ও পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করুন এবং প্রতিবার ব্যবহার শেষে লগ-আউট করুন।

৭। সন্দেহজনক কোন ইমেইল বা মেসেজ এর উত্তর প্রদান হতে বিরত থাকুন।

৮। আপনার কোন পরিচিতজনের বিপদের কথা জানিয়ে ইমেইল অথবা মেসেজ আসলে আগে যাচাই করুন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।

৯। বিপুল পরিমাণ অর্থ লটারীতে জিতেছেন-এমন তথ্যসহকারে পাঠানো ইমেইল বা মেসেজ এর উত্তর প্রদান হতে বিরত থাকুন। এসকল তথ্যসম্বলিত মেইল অনুসন্ধানে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সুত্রঃ ডিএমপি নিউজ (আগস্ট ২৯, ২০১৮)


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।

ট্রেড লাইসেন্স কোথায় ও কিভাবে করতে হয়?

ব্যবসায়ী মাত্রই ট্রেড লাইসেন্সের সাথে পরিচিত। সিটি কর্পোরেশন কর বিধান – ১৯৮৩ এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ট্রেড লাইসেন্সের সুচনা ঘটে । এই লাইসেন্স উদ্যোক্তাদের আবেদনের ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকে । ব্যবসার প্রথম এবং অবিচ্ছেদ্য একটি ডকুমেন্ট হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স (Trade Licence), আমাদের দেশে এমন অনেক সফল উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ী আছেন যারা ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করছেন কিন্তু এটা সম্পুর্ণ অবৈধ এবং আইন বিরোধি । Trade মানে হচ্ছে ব্যবসা আর Licence মানে হচ্ছে অনুমতি অর্থাৎ ট্রেড লাইসেন্স মানে হচ্ছে ব্যবসার অনুমতিপত্র । এই ট্রেড লাইসেন্স বাংলাদেশ সরকার সিটি কর্পোরেশন কর বিধান – ১৯৮৩ (City Corporation Taxation Rules, 1983) এর অধিনে ইস্যু করে থাকে । যেহেতু এই ট্রেড লাইসেন্স সরকারী প্রতিষ্ঠান হতে ইস্যু করা হয় তাই আপনার ব্যবসার বৈধতার প্রতিক হচ্ছে এই ট্রেড লাইসেন্স। সিটি করর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই লাইসেন্স প্রদান করা হয়ে থাকে ।

 ট্রেড লাইসেন্সের জন্য কিকি কাগজপত্র লাগে?
বিভিন্ন ব্যবসার জন্য বিভিন্ন ধরণের কাগজপত্র লাগে। নিম্নে বিভিন্ন প্রকার ব্যবসার জন্য কি কি ধরনের কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে তার একটি তালিকা দেয়া হলো:

সাধারণ ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স এর ক্ষেত্রে (general business license)

দোকান ভাড়ার চুক্তি পত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, নিজের দোকান হলে ইউটিলিটি বিল এবং হালনাগাদ হোল্ডিং ট্যাক্সপরিশোদের এর ফটোকপি ।
আবেদনকারীর ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ।
ব্যবসা যদি যৌথভাবে পরিচালিত হয় তাহলে ১৫০/৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে পার্টনার শিপের অঙ্গীকারনামা/শর্তাবলী জমা দিতে হবে ।

ফ্যাক্টরির/কারখানা ট্রেড লাইসেন্স এর ক্ষেত্রে (Factory / factories in the case of a trade license)

পরিবেশের ছাড়পত্রের কপি ।
প্রস্তাবিত ফ্যাক্টরি/কারখানার পাশ্ববর্তী অবস্থান/স্থাপনার বিবরণসহ নকশা/লোকেশন ম্যাপ।
প্রস্তাবিত ফ্যাক্টরি/কারখানার পাশ্ববর্তী অবস্থান/স্থাপনার মালিকের অনাপত্তিনামা ।
ফায়ার সার্ভিস এর ছাড়পত্র ।
ঢাকা সিটিকর্পোরেশন এর নিয়ম – কানুন মেনে চলার অঙ্গিকারনামা ১৫০/৩০০ টাকারজুডিশিয়ার স্ট্যাম্প এ স্বাক্ষরিত।

 সি.এন.জি ষ্টেশন/দাহ্য পদার্থ ব্যবসার ক্ষেত্রে (CNG station / combustible materials business)

বিস্ফোরক অধিদপ্তর/ ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র/অনুমতিপত্র ।

ক্লিনিক/প্রাইভেটহাসপাতালএর ক্ষেত্রে (Clinic / private hospitals in the case of)

ডিরেক্টর জেনারেল – স্বাস্থ্য , কর্তৃক অনুমতিপত্র ।

 লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে (In case of limited company)

কোম্পানির মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল ।
সার্টিফিকেট অব ইনকর্পোরেশন ।

প্রিন্টিং প্রেস এবং আবাসিক হোটেল এর ক্ষেত্রে (Printing Press and residential hotel)

ডেপুটি কমিশনার, কর্তৃক অনুমতিপত্র ।

রিক্রুটিং এজেন্সির ক্ষেত্রে (In recruiting agencies)

মানবসম্পদ রপ্তানী বুর‍্যো কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্স ।

অস্ত্র ও গোলাবারুদ এর ক্ষেত্রে (In the case of weapons and ammunition)

অস্ত্রের লাইসেন্স ।

ঔষধ ও মাদকদ্রব্যের ক্ষেত্রে (Medicines and drugs case)

ড্রাগ লাইসেন্স এর কপি ।

ট্রাভেলিং এজেন্সির ক্ষেত্রে (Travel agencies )


সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ।

ট্রেড লাইসেন্স করতে কতো টাকা (ফি) লাগে (How do you trade money (fees) takes)

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয় এর স্থানীয় সরকার বিভাগ, পৌর  – ১ শাখা হতে বিশেষ প্রজ্ঞাপন এর মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স এর ফি নির্ধারন করা হয় । ব্যবসার ধরন এর উপর ভিত্তি করে ট্রেড লাইসেন্স এর ফি নির্ধারন করা হয়েথাকে । স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য জানা যাবে।

কারা ট্রেড লাইসেন্স করতে পারবেন (Who can trade in)

নারী, পুরুষ উভয়ই ট্রেড লাইসেন্স করতে হবে তবে অবশ্যই তাকে কোন না কোন ব্যবসার সাথে জড়িত থাকতে হবে । বয়স ১৮ বছর এর উপরে হতে হবে ।

একটি ট্রেড লাইসেন্স কি একাধিক ব্যবসায় ব্যবহার করা যায় (A license key can be used for multiple business)

না একটি ট্রেড লাইসেন্স শুধু মাত্র একটি ব্যবসার জন্যই প্রযোজ্য অর্থাৎ যে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্সটি করা হয় শুধু মাত্র সেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা যাবে অন্য কোন ধরনের ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা যাবে না ।নতুন কোন ব্যবসা শুরু করলে তার জন্য নতুন ট্রেড লাইসেন্স করতে হবে ।

একটি ট্রেড লাইসেন্স কি একাধিক ব্যাক্তি ব্যবহার করতে পারবেন (A license allows you to use more than one person)

না একটি ট্রেড লাইসেন্স শুধু মাত্র একজন ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তা ব্যবহার করতে পারবেন অর্থাৎ যে ব্যবসায়ী/উদ্যোক্তার নামে ট্রেড লাইসেন্সটি করা হয়েছে এটি শুধু মাত্র তার জন্যই প্রযোজ্য । এটা কোনভাবেই হস্তান্তর যোগ্য নয় ।

ট্রেড লাইসেন্স কিভাবে এবং কোথা থেকে নবায়ন করতে হয় (How and Where to renew license)

যে অফিস থেকে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়, সেখান থেকেই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা হয় । ট্রেড লাইসেন্স সাধারনত ১ বছর এর জন্য ইস্যু করা হয় । প্রতি বছর ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে হয় । পুরানো ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়।

তথ্যসুত্রঃ টেকটিউন্স


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!

আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।