ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কি ধরা ছোয়ার বাইরে?

| প্রকাশিত হয়েছেঃ মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২০, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
ডাক্তারি পেশা মহৎ পেশা এ নিয়ে কারও কোন দ্বিমত নেই। কিন্ত ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকান্ড এই মহৎ পেশাটিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। আবারো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ইন্টার্ন চিকিৎসক দের বিরুদ্ধে  সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এটিএম এনামুল জহির কে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর আহত করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সমালোচনার এই ঝড় ওঠে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা যায় গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওর্য়াডের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কর্তব্যরত এক নারী চিকিৎসকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে শিক্ষক এনামুল জহিরের। এতে ওই ইন্টার্ন চিকিৎসক তাকে অপমানজনক কথা বলে। কথার পরিপ্রেক্ষিতে ওই অধ্যাপক তাকে ‘ননসেন’ বললে ওই ইন্টার্ন অন্য চিকিৎসকদের ডেকে নিয়ে এসে তাকে মারধর করে। তবে ওই নারী ইন্টার্ন চিকিৎকের অভিযোগ, তাকে খারাপ ভাষায় গালি দেওয়া হয়েছে। সেজন্যই এমন ঘটনা ঘটেছে। আর ওই শিক্ষকের দাবি তিনি কোন খারাপ ভাষায় গালি দেননি।




এটাই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগেও অনেকবার ইন্টার্ন চিকিৎসক দের হাতে রোগীর আত্মীয় স্বজনরা মারধরের শিকার হয়েছেন ও লাঞ্ছিত হয়েছেন। কখনো ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়েছেন।  এর আগে গত বছরের ১৫ই নভেম্বর রামেকের ১৬ নং ওয়ার্ডে নাটোরের চাঁদপুর এলাকার জয়নাল (৭০) নামে এক ব্যক্তি রক্তের সমস্যায় ভর্তি হন। ওই রোগীর দুই স্বজন সাদ্দাম (২২) ও নাহিদ (২৩) চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলতে গেলে ইন্টার্ন চিকিৎসক কেএম সালাউদ্দিনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে আরো কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক জড়ো হয়ে সাদ্দাম ও নাহিদকে একটি ঘরে আটকিয়ে রেখে মারপিট করে পুলিশে সোপর্দ করেন।


(এটিএম এনামুল জহির)

এছাড়া বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এক মুমূর্ষু রোগীর স্বজনকে দফায় দফায় মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা তো সারাদেশের লোক স্বাক্ষী হয়ে আছে। এ ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে নালিশ করতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের সামনে রোগীর আরেক স্বজনসহ দুই নারীর ওপর হামলা চালান ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।এসব ঘটনা চলার সময় বেলা একটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।মুমূর্ষু ওই রোগীর প্রহৃত স্বজনের নাম আবদুর রউফ সরকার (৩৮)। ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাঁকে হাসপাতালের পরিচালকসহ অনেকের সামনে ১০০ বার কান ধরে ওঠবস করান এবং পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। পরে তাঁকে পুলিশেও সোপর্দ করা হয়। এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের সত্যতা পেলে চার ইন্টার্ন চিকিৎসকের ইন্টার্নশিপ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সারাদেশব্যপী ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আআন্দোলন কারনে উক্ত আদেশ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।


গত বছরের ১৯ নভেম্বর আরেকটি দুঃখজনক ঘটনার জন্ম দেন বরিশালের শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।আমেনা বেগম (২২) নামে এক প্রসূতি রোগীর পেটে লাথি মারেন এক ইন্টার্ন চিকিৎসক। রাকিব নামের এক ইন্টার্ন ডাক্তার রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাপত্রে উল্লেখ করেন, ‘রক্ত ম্যানেজ করতে না পারায় রোগীর অবস্থা উন্নতি হচ্ছে না’। এসময় রক্তের ব্যবস্থা করার পরও চিকিৎসক কর্তৃক রোগীর ব্যবস্থাপত্রে এমন কথা কেন উল্লেখ করা হয়েছে- এ নিয়ে রোগীর স্বামী শাহিন ও ইন্টার্ন ডাক্তার রাকিবের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এসময় একদল ইন্টার্নি ডাক্তার এসে রোগীর সামনেই শাহিন ঢালীকে মারধর করার পাশাপাশি রোগীর পেটে কোনো এক ইন্টার্ন ডাক্তার লাথি মারেন। ওই লাথির কারণে রোগীর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এছাড়া গত ১০ ডিসেম্বর  এক রোগীর স্বজন ওষুধ নিয়ে ওয়ার্ডের ভেতরে প্রবেশ করলে ইন্টার্ন চিকিৎসক মাহাদী নামের রোগীর ওই স্বজনকে বাইরে যেতে বলেন। তিনি জানান, ওষুধ দিয়েই চলে যাবেন। কিন্তু  এক ইন্টার্ন চিকিৎসক তাকে তখনই চলে যেতে বলেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে অন্য ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীর ওই স্বজনকে মারধর করে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেয়
(এটিএম এনামুল জহির)

গত ২৭শে অক্টোবর, ২০১৭ তারিখে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় রোগীর স্বজনদেরকে মারপিট করে মাথা ফাটিয়ে দেয় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) এর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। স্বজনদের উপর হামলার পর ওই রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ছাড়পত্র দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর পরপরই অন্য হাসপাতালে নেয়ার পথে রোগীর মৃত্যু হয়। 

এভাবে ইন্টার্ন চিকিৎসক কর্তৃক প্রতিনিয়ত রোগীর স্বজনদেরকে মারধর ও লাঞ্ছিতের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ ও আতংকের জন্ম দিচ্ছে। জন্ম দিচ্ছে বিভিন্ন প্রশ্নের। ডাক্তারদের প্রতি শ্রদ্ধা হারাচ্ছে জনগণ।

এমনটা কেন ঘটছে?

উপরোক্ত ঘটনাগুলো হাল্কা করে দেখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করিনা। যদি এমনিভাবে চলতে থাকে তাহলে দিন দিন পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। রাবির শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় রাবির শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। ওদিকে রামেকের ইন্টার্ন চিকিৎসকরাও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিচ্ছে। আগের ঘটনাগুলোতে সাধারণ ব্যক্তিদেরকে মারধর বা হয়রাণী করা হয়েছে। তারা প্রতিবাদ করতে পারেনি। কারণ তাদের না আছে জনবল না আছে টাকা পয়সা আর না আছে ক্ষমতা। কিন্তু এবার রাবির আইন বিভাগের তুমুল জনপ্রিয় একজন শিক্ষক কে মারধরের ঘটনায় ফুষে উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। 
কিন্তু বারবার ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিভিন্ন তুচ্ছ ঘটনায় নিজেদেরকে বিচারকের আসনে বসিয়ে রোগীর স্বজনদের কথিত খারাপ আচরণের বিচার করে শাস্তি দেওয়ার এই প্রবণতা দেখাচ্ছেন কেন? কেন তারা এত মারমুখী আচরণ করছেন? উত্তর টা বোধহয় খুবই সরল। দোষী চিকিৎসকদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলেই তারা বারবার এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস পাচ্ছেন। এটা খুবই স্বাভাবিক যে অপরাধী অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে বারবার সে অপরাধ করবে। অপরাধ করতে করতে অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।
 ইন্টার্ন চিকিৎসক দের এমন অন্যায়ের উপযুক্ত তদন্ত করা হচ্ছে না। যদিও বা দুই একটি তদন্তে ইন্টার্ন চিকিৎসক রা দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন কিন্তু তাদের কে শাস্তিদান করা যাচ্ছে না। কারণ তাদেরকে শাস্তি দিলে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা আন্দোলন করছেন। কর্মবিরতি করছেন। ফলস্বরুপ রোগীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। পোহাচ্ছেন চরম দুর্ভোগ। এজন্য প্রশাসন ও হাত পা গুটিয়ে বসে থাকছেন। ফলে অপরাধীরা ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আরও নতুন উদ্যমে অপরাধ করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা জানে গরীব অসহায় এই রোগী বা তার স্বজনেরা কিচ্ছুই করতে পারবে না। কারণ প্রশাসনই যেখানে অসহায় সেখানে এই সব গরীব অসহায় মানুষ তো মামুলি ব্যাপার।


ডাক্তারদের অভিযোগটা কি

ইন্টার্ন ডাক্তারদের অভিযোগ গুলোও একবার আলোচনায় আনা দরকার। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে অবিচার করা হবে বৈকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের অভিযোগ হলো রোগীর এসব আত্মীয় স্বজনেরা তাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। তাই তারা এমন শাস্তি দিয়েছেন। ধরে নিচ্ছি তারা সত্য কথা বলছেন। 
কিন্তু ডাক্তার দের একটি কথা সবসময় মনে রাখা দরকার। ডাক্তারদের হাত রোগীর জীবন বাচানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। কারও খুন করা বা মেরে আহত করা বা লাঞ্ছিত করার কাজে ঐ হাত বড্ড বেমানান। হ্যা হতে পারে উপরের ঘটনা গুলোতে রোগীর স্বজনদের কিছু দোষ ত্রুটি ছিল। তাই বলে কি তাদেরকে মেরে লাঞ্ছিত করে তার প্রতিশোধ নেয়াটা শোভনীয় হয়েছে? দোষ করলে তাদেরকে পুলিশে সোপর্দ করতে পারতেন বা পরিচালকের কাছে রিপোর্ট করতে পারতেন ঐ স্বজনদের নামে। তারা বিষয়টি মীমাংসা করতেন। কিন্তু এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কেন? 
ডাক্তারদের বোঝা উচিত রোগীর আত্মীয় স্বজন রা মানসিক ভাবে ভংগুর অবস্থায় থাকেন। বিভিন্ন টেনশন উদ্বেগ উৎকন্ঠা কাজ করতে থাকে তাদের মধ্যে। এমন অবস্থায় মেজাজ তাদের খিটখিটে থাকবে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। এই খিটখিটে মেজাজে অনেক আত্মীয় স্বজন খারাপ আচরণ করতে পারেন। কিন্তু এই খারাপ আচরণের জবাব খারাপ আচরণ দিয়ে করাটা মোটেও শোভনীয় নয়। এই সব অপরাধী ইন্টার্ন ডাক্তাররা হয়তো মনে মনে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। তারা হয়ত ভাবছে তারা ধরা ছোয়ার বাইরে এবং সারাজীবন ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাবেন। কিন্তু এমন ভাবাটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। কারণ আইনের ঊর্ধে কেউ নয় এটাই চিরন্তন সত্য।
আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন  নিচে মন্তব্যের ঘরে

পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »