চেকের মামলায় যে সকল ক্ষেত্রে আসামীর প্রতি অবিচার করা হয়

আদালত পাড়ায় বাদী, বিবাদী, অভিযোগকারী, আসামী সবাই আসে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশায়।সবারই মনে আশা আকাঙ্খা থাকে বিজ্ঞ আদালত হতে সে ন্যায়বিচার পা...

আদালত পাড়ায় বাদী, বিবাদী, অভিযোগকারী, আসামী সবাই আসে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশায়।সবারই মনে আশা আকাঙ্খা থাকে বিজ্ঞ আদালত হতে সে ন্যায়বিচার পাবে।আমাদের কমন ল সিস্টেমে একটি বহুল আলোচিত নীতি হলো যতক্ষণ না উপযুক্ত আদালত কর্তৃক উপযুক্ত বিচারে কোন আসামী দোষী প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন আসামীকে দোষী বলা যাবেনা। কারণ টা হলো উপযুক্ত বিচার শেষে ফলাফলটা কি হবে তা কেউ বলতে পারেনা। বিচার শেষে আসামী দন্ডিতও হতে পারে আবার খালাসও পেতে পারে। এই স্থানে বাদী ও আসামীর পজিশন বিজ্ঞ আদালতের নিকট একই থাকে। কারণ ভুক্তভোগী শুধু বাদীই নয় আসামীও হতে পারে। উল্লেখ্য যে, অনেকেই মনে করেন যে আসামী মানেই সে ব্যক্তি দোষী। কিন্তু এই ধারণা ভুল। আসামী মানে অভিযুক্ত ব্যক্তি অর্থ্যাৎ কোন একটি অপরাধের জন্য তাকে শুধুমাত্র অভিযুক্ত করা হয়েছে।অভিযুক্ত যে কেউ হতে পারে। তেমনিভাবে চেকের মামলায় চেকদাতাও অভিযুক্ত ব্যক্তি। এই অভিযুক্ত বা আসামী বিজ্ঞ আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায়। আমার মতে চেকের মামলায় আসামী বিভিন্ন স্তরে অবিচারের মুখোমুখি হয়। আগেই বলে রাখি এটা শুধুমাত্র আমার পর্যবেক্ষণ। আমার পর্যবেক্ষণ ভুলও হতে পারে তবে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কিছু বিষয় নিম্নে পাঠকের সামনে তুলে ধরবো যেখানে চেকের মামলায় আসামীর প্রতি অবিচার করা হয় বা অবিচার করার মতো যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে।

দন্ডিত হওয়ার ক্ষেত্রে অবিচার

হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইনের ১৩৮ ধারা মোতাবেক কোন ব্যক্তি তার একাউন্টে পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা নেই জেনেও যদি অন্য কারও বরাবর চেক ইস্যু করে এবং চেকটি যদি যথাসময়ে এবং যথাযথভাবে ডিজঅনার হয় এবং এই ডিজঅনারের বিষয়টি চেকদাতাকে যথাযময়ে জানানোর পরও নির্দিষ্ট সময়ে টাকা পরিশোধ না করে তাহলে চেকদাতা অপরাধ করেছে বলে ধরা হয়। ‍উক্ত অপরাধ ১৩৮ ধারার বিধান মোতাবেক শাস্তিযোগ্য। আইন অনুযায়ী চেক ডিজঅনারের মামলা করা হয় চেকদাতার শাস্তি নিশ্চিত করার  জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, চেক গ্রহীতা তার টাকা আদায়ের নিমিত্তেই এই ধারায় মামলা দায়ের করে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদীকে সফল হতে দেখা যায়। ১৩৮ ধারার মামলার শুনানীর সময় দেখা যায় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদী বা অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে বিজ্ঞ আদালতে এই যুক্তি উথাপন করা হয় যে, চেকের মামলায় শুধু দেখার বিষয় তর্কিত চেকটি আসামী ইস্যু করেছিল কিনা, চেকটি যথাসময়ে ডিজঅনার হয়েছে কিনা, যথাসময়ে লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হয়েছে কিনা এবং যথাসময়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে কিনা। এর বাইরে কোন কিছু বিবেচনা করার সুযোগ নেই।অনেক আদালত বাদীপক্ষের এই যুক্তিকে আমলে নিয়ে আসামীর বিরুদ্ধে দন্ডাদেশ আরোপ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো ১৩৮ ধারা কি কোন বিচ্ছিন্ন ধারা? এই আইনে কি শুধুমাত্র একটিই ধারা আছে? এই ধারায় কি এমন কোন ক্লজ আছে (যেটিকে নন অবস্ট্যান্টে ক্লজ বলা হয়) যেখানে বলা হয়েছে যে অন্য কোন আইনে বা ধারায় যায় বলা থাক না কেন এই ধারার বিধানাবলীই প্রযোজ্য হবে? এমন কোন ক্লজ এই ধারায় নেই। কাজেই শুধুমাত্র ১৩৮ ধারার উপর  নির্ভর করে কোন রায় প্রদান করলে তা কতটুকু যুক্তিসংগত হবে তা আমার বোধগম্য নয়। চেকদাতা সব সময় স্বেচ্ছায় চেক ইস্যূ করে না। বাদী চেকদাতার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে চেকে স্বাক্ষর করিয়ে নিতে পারে, প্রতারণার মাধ্যমে নিতে পারে, চুরি করে নিতে পারে, জিম্মি করে স্বাক্ষর নিতে পারে। বিভিন্ন পরিস্তিতিতে চেকদাতা চেকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হতে পারে। চেকদাতাকে জিম্মি করে বা ভয় দেখিয়ে বা প্রতারণা করে বা চুরি করে বাদী তর্কিত চেকে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে প্রথম বার অবিচার করলো। ঐ তর্কিত চেক দিয়ে মামলা করে চেকদাতা কে দন্ডিত করে দ্বিতীয়বার অবিচার করা হলো। চেকের মামলার বিচারের সময় আসামীর দাখিলকৃত জিডির কপি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে স্টপ পেমেন্ট এর আবেদন, প্রতারণার সাবমিশন ইত্যাদি অনেক আদালতই আমলে নেন না। আমাদের দেশের মহামান্য আপীল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, চেকের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে ১৩৮ ধারার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারাও বিবেচনায় নিতে হবে। ১৩৮ ধারা বিচ্ছিন্ন কোন ধারা নয়।

আপীলের শর্তে জামিনের ক্ষেত্রে অবিচার

চেকের মামলা জামিনযোগ্য তাই জামিন পাওয়াটা আসামীর অধিকার। চেকের মামলায় দন্ডাদেশ হওয়ার পর আসামী উচ্চ আদালতে আপীল করতে চাইলে তাকে ১৩৮ এ ধারা মোতাবেক তর্কিত চেকে বর্ণিত টাকার ৫০% টাকা বিচারিক আদালতে দাখিল স্বাপেক্ষে আপীল করতে হবে। এক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামী উচ্চ আদালতে আপীলের শর্তে বিজ্ঞ বিচারিক আদালত হতে জামিন নেন। আদালত নির্দিষ্ট সময় বেধে দেন আপীল দায়ের এর জন্য। আসামী জামিন পেয়ে বাইরে বেরিয়ে টাকা সংগ্রহ করে উচ্চ আদালতে আপীল করতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আসামী কর্তৃক ৫০% টাকা জমা দিলেেই জামিন পাওয়া যায় নতুবা আসামীকে জামিন দেওয়া হয় না। আসামীর জামিনের সাথে ৫০% টাকা জমা দেওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞ আদালত চাইলেই আসামীকে উচ্চ আদালতে আপীলের শর্তে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জামিন দিতে পারেন। তাহলে আসামী জামিনে থেকে টাকা সংগ্রহ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে আসামীকে ৫০% টাকা জমা প্রদাণ করেই জামিন নিতে হয়।

আপীল দায়েরের ক্ষেত্রে অবিচার

১৩৮ এ ধারা মোতাবেক তর্কিত চেকে বর্ণিত টাকার ৫০% টাকা বিচারিক আদালতে দাখিল স্বাপেক্ষে আপীল করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথা হলো আদালতের অনুমতি স্বাপেক্ষে আসামী ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে ৫০% টাকা জমা দিয়ে তার কপি আপীলের মেমোর সাথে সংযুক্ত করে দিতে হয় যাতে করে আপীল আদালত বুঝতে পারেন যে, আসামী আইনের বিধান মেনে ৫০% টাকা জমা দিয়ে আপীল দায়ের করেছে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, আইনে বলা হয়েছে চেকে বর্ণিত টাকার  ৫০% টাকা জমা দিতে হবে। আসামী ৫০% টাকা বাদীর নামে জমা করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মামলা চলাকালীন সময়ে বাদী এবং আসামীর মধ্যে আপোষ মীমাংসা হয়।ফলে আসামী বাদীর টাকা কিছু কিছু করে পরিশোধ করতে থাকে এবং ৫০% এরও বেশি টাকা বাদীকে পরিশোধের পর বিজ্ঞ আদালত রায় দেন। এক্ষেত্রে একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাহলো আসামী চেকে বর্ণিত টাকার ৫০% এরও অধিক টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করে দিলেও কি তাকে আবার নতুন করে তর্কিত চেকের ৫০% টাকা জমা দিয়ে আপীল করতে  হবে? নাকি আসামী যে ৫০% টাকার অধিক টাকা বাদীকে পরিশোধ করে দিয়েছে তার উপযুক্ত কোন প্রমাণপত্র বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করলেই চলবে? আইন অনুযায়ী আপীল আদালতের এটা দেখার বিষয় যে  আসামী তর্কিত চেকে বর্ণিত টাকার ৫০% টাকা জমা দিয়েছে কি দেয়নি। ৫০% টাকা জমা দেওয়ার উপযুক্ত কোন প্রমাণ পত্র বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করলেই হয়ে যাওয়ার কথা। উপযুক্ত প্রমাণপত্র হিসেবে এখানে বাদীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সহি মুহুরি নকল ব্যবহার করা যেতে পারে।কারণ আসামীর দায় হলো এটা দেখানো যে সে তর্কিত চেকের ৫০% টাকা ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে তা ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে হোক, পে অর্ডারের মাধ্যমে হোক বা অন্য কোন প্রমাণ পত্রে মাধ্যমে হোক।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, যদি ২৫ লক্ষ টাকার চেকের মামলা হয় এবং মামলা চলাকালীন সময়ে বাদীর সাথে আপোষের কারণে আসামী ২০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করে যাহা বাদী তার জবানবন্দি ও জেরারকালীন সময়ে বিজ্ঞ আদালতে স্বীকার করে এবং পরবর্তীতে যদি এমন রায় হয় যে আসামীকে ৫ লক্ষ্য টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হলো তথাপিও আসামীকে পূণরায় ২৫ লক্ষ টাকার অর্ধেক অর্থ্যাৎ ১২.৫০ লক্ষ টাকা ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে তার পর আপীল দায়ের করতে হয়। অর্থ্যাৎ চেকে বর্ণিত টাকার পরিমাণ ২৫ লক্ষ কিন্তু আসামী জমা দিলো মোট ২০+১২.৫০= ৩২.৫০ লক্ষ টাকা। মামলা চলাকালীন সময়ে আসামীর প্রদত্ত টাকা বিজ্ঞ আপীল আদালত আপীলের ক্ষেত্রে আমলে নেন না অর্থ্যাৎ চেকে বর্ণিত টাকার ৫০% টাকা নতুন করে ট্রেজারী চালানের মাধ্যমে জমা না দিলে উক্ত আসামী আপীলই দায়ের করতে পারে না। ফলে আসামীকে অবিচারের সম্মখীন হতে হয়। 
এই অবস্থা চলতে থাকলে কোন আসামীই মামলা চলাকালীন সময়ে টাকা পয়সা পরিশোধ করতে চাইবে না। এতে বাদী ও আসামী উভয়েরই ক্ষতি হবে।
আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন মন্তব্যের ঘরে

COMMENTS

BLOGGER: 8
Loading...
নাম

আইন শৃঙ্খলা,1,আদালতে হাতেখড়ি,5,উত্তরাধিকার আইন,5,এডভোকেট আজাদী আকাশ,10,কাস্টমস ম্যাটার,1,কোম্পানী ম্যাটার,5,খতিয়ান,1,গবেষণাধর্মী ভয়েস,1,চাকরির আইন,2,চেইন ভয়েস,5,চেকের মামলা,6,জমির আইন,8,জেল কোড,2,তথ্য প্রযুক্তি আইন,3,দেওয়ানী আইন,6,নির্বাচিত ভয়েস,14,পারিবারিক আইন,11,ফৌজদারি আইন,27,বাল্য বিবাহ,2,বিদ্যুৎ আইন,1,বিবিধ ভয়েস,6,মত-মতান্তর,8,মুসলিম আইন,1,মেডিকেল আইন,2,মোটরযান আইন,2,রুদ্র রায়হান,1,
ltr
item
লিগ্যাল ভয়েস | আইন সম্পর্কিত দেশের সর্ববৃহৎ বাংলা ব্লগ সাইট: চেকের মামলায় যে সকল ক্ষেত্রে আসামীর প্রতি অবিচার করা হয়
চেকের মামলায় যে সকল ক্ষেত্রে আসামীর প্রতি অবিচার করা হয়
https://4.bp.blogspot.com/-9t26mbtJ2lQ/WpKiS6rgp2I/AAAAAAAAAUU/71FHfty117gPvYWk6rKskb2v-7OfqV07QCLcBGAs/s1600/Untitled-1.png
https://4.bp.blogspot.com/-9t26mbtJ2lQ/WpKiS6rgp2I/AAAAAAAAAUU/71FHfty117gPvYWk6rKskb2v-7OfqV07QCLcBGAs/s72-c/Untitled-1.png
লিগ্যাল ভয়েস | আইন সম্পর্কিত দেশের সর্ববৃহৎ বাংলা ব্লগ সাইট
https://www.legalvoicebd.com/2018/02/blog-post_25.html
https://www.legalvoicebd.com/
https://www.legalvoicebd.com/
https://www.legalvoicebd.com/2018/02/blog-post_25.html
true
7733942801169440399
UTF-8
সকল ভয়েস লোড হয়েছে কোন ভয়েস পাওয়া যায়নি সব দেখুন বিস্তারিত পড়ুন উত্তর Cancel reply Delete By প্রথম পাতা বাকিটুকু পরবর্তী পাতায় দেখুন POSTS সব দেখুন আপনার জন্য আরও ভয়েস ভয়েস বিভাগ ARCHIVE খুজে দেখুন সকল ভয়েস দুঃখিত, আপনার অনুরোধ অনুযায়ী কোন ভয়েস পাওয়া যায়নি। প্রথম পাতায় ফিরে যান Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy