বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তি

| প্রকাশিত হয়েছেঃ মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
এতদিন ১৯১০ সালের ১৮ মার্চ মাসে প্রণীতে ইলেক্ট্রিসিটি এ্যাক্ট দিয়ে চলছিল বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত। সময় বদলেছে। পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। ১০০ বছরে বিদ্যুৎ বিভাগ পরিচালনায় সাতটি পৃথক আইন করা হলও মূল বিদ্যুৎ আইন পরিবর্তন করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে জারি করা আলাদা নীতিমালা বা বিধিমালা দিয়েই মূলত বিদ্যুৎ খাত চলেচছল। পুরো খাত নিয়ন্ত্রণে একক কোনও আইন না থাকায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্টদের। বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন, সরবরাহ ও বিতরণ খাতের উন্নয়ন, সংস্কার সাধন, উন্নত গ্রাহক সেবা প্রদান এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে Electricity Act, 1910 রহিতপূর্বক সংশোধন করে বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ পাশ করেছে। ১০৮ বছর পর এটিই বাংলাদেশের প্রথম বিদ্যুৎ আইন।এতদিন পুরাতন জরাজীর্ণ ইলেকট্রিসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ খাত পরিচালিত হলেও বর্তমানে বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ খাত পরিচালিত হবে।


এই আইনের ৩২ ধারা থেকে ৫২ ধারা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা যেহেুতু সকলেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকি তাই বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধ ও এর শাস্তি সম্পর্কে জানা আমাদের সকলের জন্য অপরিহার্য্য একটি বিষয়। নিচে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধ ও এর শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

বিদ্যুৎ চুরি করার শাস্তি
৩২ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি বাসগৃহ বা কোন স্থানে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ চুরি করলে অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড অথবা চুরিকৃত বিদ্যুতের মূল্যের দ্বিগুণ অথবা ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এছাড়া কোন ব্যক্তি শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ চুরি করলে অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড অথবা চুরিকৃত বিদ্যুতের মূল্যের দ্বিগুণ অথবা ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এখানে বিদ্যুৎ চুরি’’ অর্থ অবৈধ পন্থায় বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ করিয়া উহার ভোগ্য বা ব্যবহার করাকে বোঝায়।
 
কৃত্রিম পদ্ধতি স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করার শাস্তি
৩৩ ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি অবৈধভাবে লাইসেন্সির বিদ্যুৎ সংযোগে কোন যন্ত্র, ডিভাইস বা কৃত্রিম পদ্ধতি স্থাপন বা ব্যবহার করলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এছাড়া যদি কোন বাসগৃহে কোন যন্ত্র, ডিভাইস বা কৃত্রিম পদ্ধতি স্থাপনের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে লাইসেন্সির বিদ্যুৎ সংযোগ গ্রহণ, ভোগ বা ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে ভিন্নরূপ কিছু প্রমাণিত না হলে, উক্ত চত্বরের দখলদার অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে।
  
বিদ্যুৎ অপচয়কারীর শাস্তি
৩৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ অপচয় করলে বা বিদ্যুতের সরবরাহ ঘুরিয়ে দিলে অথবা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কোন বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন বা পূর্তকর্ম কেটে দিলে বা ক্ষতিগ্রস্ত করলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অন্যূন ১ (এক) বৎসর এবং অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড বা ৫(পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
  
বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চুরি, অপসারণ বা বিনষ্ট করার শাস্তি
৩৫ ধারার বিধান অনুযায়ী কোন ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা উপকেন্দ্র বা স্থাপনার কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি অথবা বিদ্যুৎ লাইন সামগ্রী, যেমন-পোল, টাওয়ারের অংশ বিশেষ, কন্ডাক্টর, ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক তার, ইত্যাদি চুরি, অপসারণ, বিনষ্ট বা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিসাধন করলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অন্যূন ২ (দুই) বৎসর এবং অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার এবং অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
  
চুরিকৃত মালামাল দখলে রাখার শাস্তি
৩৬ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি ধারা ৩৫ এ উল্লিখিত যন্ত্রপাতি বা বিদ্যুৎ লাইন সামগ্রী চুরি হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা সত্ত্বেও উক্ত চুরিকৃত মালামাল নিজ দখলে রাখলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

  
অবৈধ, ত্রুটিযুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করার শাস্তি
৩৭ ধারায় লাইসেন্সির শাস্তির বিধান সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী কোন লাইসেন্সি- (ক) ধারা ২৬ এর বিধান সাপেক্ষে, সরবরাহ এলাকার বাহিরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে বা কোন বিদ্যুৎ লাইন বা পূর্তকর্ম স্থাপন করলে, (খ) এই আইন বা বিধির কোন বিধান লঙ্ঘন করলে বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করলে; অথবা (গ) ত্রুটিযুক্ত বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করলে; তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য উক্ত লাইসেন্সি অথবা অপরাধ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ অনধিক ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
  
মিটার, পূর্তকর্মে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং বিদ্যুতের অননুমোদিত ব্যবহারের শাস্তি
৩৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি-

(ক) লাইসেন্সির লিখিত অনুমতি ব্যতীত বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের সহিত মিটার সংযোগ স্থাপন করলে বা বিচ্ছিন্ন করলে অথবা অন্য কোন স্থাপনার সহিত যোগাযোগ রক্ষার্থে কোন যন্ত্র স্থাপন করলে;

(খ) লাইসেন্সির লিখিত অনুমতি ব্যতীত মিটার হতে অন্য কোন ব্যক্তিকে পার্শ্ব সংযোগ প্রদান করলে;

(গ) মিটারের ক্ষতিসাধন করলে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে বা প্রতারণামূলকভাবে মিটারের ইনডেক্স পরিবর্তন করলে অথবা উহাদের যথাযথ রেজিস্টারে বাধার সৃষ্টি করলে; অথবা

(ঘ) লাইসেন্সি কর্তৃক সরবরাহকৃত বিদ্যুতের উচ্চতর হার পদ্ধতির পরিবর্তে নিম্নতম হার পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বা কোন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে;

তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
  
বিদ্যুৎ স্থাপনা অনিষ্ট সাধনের শাস্তি 
৩৯ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, বিদ্যুৎ লাইন, খুঁটি বা অন্যবিধ যন্ত্রপাতি নাশকতার মাধ্যমে ভেঙ্গে ফেললে বা ক্ষতিগ্রস্ত করলে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন বা যন্ত্রের উপর কোন বস্তু নিক্ষেপ করলে বা রাখলে তা একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য তিনি অন্যূন ৭(সাত) বৎসর এবং অনধিক ১০(দশ) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১০(দশ) কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। এছাড়া কোন ব্যক্তি লাইসেন্সির অনুমতি ব্যতিরেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, বিদ্যুৎ লাইন, খুঁটি বা অন্যবিধ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে অবহেলাবশত ভেঙ্গে ফেললে বা ক্ষতিগ্রস্ত করলে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন বা যন্ত্রের উপর কোন বস্তু নিক্ষেপ করলে বা রাখলে তিনি অনধিক ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড অথবা ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
 
 অন্যান্য অপরাধের শাস্তি
৪০ ধারায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি যদি এই আইনে সুনির্দিষ্টভাবে দণ্ডের বিধান উল্লেখ নেই এইরূপ কোন বিধান অথবা বিধির কোন বিধান লঙ্ঘন করেন তাহলে তিনি অনধিক ৬(ছয়) মাস কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১০(দশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।
  
অপরাধ সংঘটনে সহায়তার শাস্তি 
ধারা ৪১ এ বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনা করলে এবং উক্ত সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনার ফলে অপরাধটি সংঘটিত হলে, উক্ত সহায়তাকারী, ষড়যন্ত্রকারী বা প্ররোচনাদানকারী তার সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনা দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য নির্দিষ্টকৃত দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

বিদ্যুৎ যেহেতু রাষ্ট্রীয় একটি সম্পদ। তাই বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেষ্ট হোন। বিদ্যুৎ সংক্রান্ত অপরাধ সহ যেকোন অপরাধ এড়িয়ে চলুন। আইনি ঝামেলামুক্ত জীবন যাপন করুন।  


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে

পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »