মৃত্যুদণ্ডই হোক শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি

| প্রকাশিত হয়েছেঃ রবিবার, এপ্রিল ২২, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশি দেশ ভারতের কাঠুয়া, উন্নাও এবং সুরাতসহ বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তাল ভারত। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়ায় আট বছরের শিশু আসিফা বানুকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ভারতের রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের মানুষরাও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। 




দেশ জুড়ে ধর্ষণের প্রতিবাদ ও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শনিবার (২১/০৪/২০১৮) শিশু ধর্ষণের সাজা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা। শনিবার একটি অধ্যাদেশ এনে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সায় দিয়ে দেয়া হয়। অধ্যাদেশটি স্বাক্ষরের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। সেই অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করার পর শিশু ধর্ষণের চূড়ান্ত শাস্তি হিসাবে কার্যকর হয়ে গেল মৃত্যুদণ্ড।ফলশ্রুতিতে মোদী সরকারের হাত ধরে ভারতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। কারণ এর আগেও ধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তাল ভারতবাসীর দাবি ছিল ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হোক। কিন্তু আগে তা প্রত্যেকবারই বাতিল হয়ে যায়।

ঐ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ১২ বছরের মেয়ে বা তার চেয়ে কম বয়সী শিশুদের ধর্ষণ করা হলে তার সাজা হবে মৃত্যুদণ্ড অথবা ১৪ বছরের জেল বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এছাড়াও আইনে বলা হয়েছে কোনো ১২ বছরের মেয়ে বা তার কম বয়সী মেয়েকে গণধর্ষণ করা হলে তার নূন্যতম সাজা ২০ বছরের কারাবাস হবে। শুধু তাই নয়, আইনে কোনো মহিলাকে ধাওয়া করে হেনস্থা, বিয়ের আগে সঙ্গমসহ কোনো মহিলার পোশাক টেনে হেনস্থার বিষয়েও সাজা ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।


বাংলাদেশে ভারতের মত তোলপাড় সৃষ্টি না হলেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য আসিফা বানু ধর্ষিত হচ্ছে। এই ধর্ষণের সংখ্যা নেহাতই কম নয়।২০১৭তে মোট ৫৯৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ৭০টি শিশু গণধর্ষিত হয়েছে, ৪৪টি প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিশু ধর্ষিত হয়েছে, ২২টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৭টি শিশু ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়াও ৭২টি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ৫১টি শিশু ইভটিজিং এবং ৯০টি শিশু যৌন নিপীড়ন/হয়রানির শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৫টি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সেই সাথে অব্যাহতভাবে বেড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকালে বখাটেদের উত্পাত এবং পর্নোগ্রাফির শিকারের ঘটনা। ২০১৭তে বখাটেদের হাতে লাঞ্ছনা, মারধর এমনকি হামলা জখম হয়েছে ৬২ মেয়ে শিশু এবং প্রতিবাদ বা প্রতিহত করতে গিয়ে বখাটেদের হামলায় আহত হয়েছে ৫০ অধিক অভিভাবক।২০১৬ সালে ৩৫৮৯টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল যাদের মধ্যে ১৪৪১ শিশু অপমৃত্যুর এবং ৬৮৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। (দৈনিক ইত্তেফাক ০৯ জানুয়ারি, ২০১৮)

উপরোক্ত পরিসংখ্যান হতে এটা সহজেই অনুমেয় যে, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যার হার কতটা ভয়াবহ। নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, বৃদ্ধা ধর্ষণসহ যেকোন ধর্ষণই জঘন্য ও বর্বর হলেও শিশু ধর্ষণ এতটা জঘন্য এতটা বর্বর যে ভাবতেই যেন শরীরটা শিউরে ওঠে। শিশুদের কোন জাত নেই, ধর্ম নেই। শিশুদের একটাই পরিচয় তারা নিষ্পাপ। তারা ফেরেশতাদের মত/দেবীদের মত পবিত্র। এমন নিষ্পাপ, এমন পবিত্র কোমলমতি শিশুদেরকে যৌন লালসার শিকার বানালে সেই সকল পশুদের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্যকিছু ভাবা যায় না। ভারত যেটি করলো সেটি ভারতের ইতিহাসে স্থান পাওয়ার মত একটি ঘটনা বটে।

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদেরকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ২০০০ সনে পাশ করা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। এই আইনে ধর্ষকদের জন্য কি কি শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে সেটি দেখে নেয়া যাক। এই আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে যে-

(১) যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷
ব্যাখ্যা৷- যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ১[ ষোল বত্সরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ২[ ষোল বত্সরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন৷

(২) যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷

(৩) যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষন করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হইলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।


(৪) যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে-

(ক) ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন;

(খ) ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বত্সর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷

(৫) যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন নারী ধর্ষিতা হন, তাহা হইলে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হইলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বত্সর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বত্সর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন৷

আইনের উপরোক্ত বিধান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, নারী বা শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয় নি। নারী ও শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে ধর্ষণের ফলশ্রুতিতে নারী বা শিশুটি যদি মারা যান তাহলেই কেবল ধর্ষকের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। এছাড়া আইনের উক্ত বিধানে নারী ও শিশুকে আলাদাভাবে দেখা হয়নি। অর্থাৎ একজন নারী ধর্ষিতা হলেও যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তেমনিভাবে একটি শিশু ধর্ষিতা হলেও সেই একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। নারী ধর্ষণের তুলনায় শিশু ধর্ষণ যেহেতু বেশি স্পর্শকাতর, বেশি বর্বর, বেশি জঘন্য সেই বিবেচনায় শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা এখন সময়ের দাবি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধন করে শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড করা হলে উক্ত জঘন্য ও বর্বর অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি হত। এক্ষেত্রে ভারতের মত শিশুর বয়স ১২ বছর নির্ধারণ করে বিদ্যমান আইনটির সংশোধন করা যেতে পারে।
আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।
পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »