ধর্ষিত হলে প্রাথমিকভাবে অবশ্যই যে পদক্ষেপ নিবেন

| প্রকাশিত হয়েছেঃ রবিবার, মে ১৩, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
পৃথিবী বদলেছে। বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। আদিম যুগ পার করে এখন আমরা সভ্য (?) জাতি হয়েছি। সভ্যতার সংজ্ঞা আর আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া জঘন্য অপরাধের চিত্র পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায় যে, আমরা কতটা সভ্য হতে পেরেছি।প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে যে সব জঘন্য অপরাধের বিস্তার ঘটছে,ধর্ষণ তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বর্বর ও জঘন্যতম। প্রতিদিনই আমাদের দেশে আমাদেরই মা, বোন, স্ত্রী ও মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না দুধের শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধা মহিলারাও। গ্রাম বা শহরে রাস্তাঘাটে অথবা ঘরে কখনো আবার বাসে কিংবা লঞ্চে কোথাও নিরাপদ নয় আমাদের নারীরা। ঘরে ঢুকে বাবা-মা কিংবা স্বামীকে বেঁধে রেখে ধর্ষণ, রাস্তায় ভাইকে বেঁধে রেখে বোনকে ধর্ষণ, বেড়াতে গেলে ফুঁসলিয়ে বা চকলেট দিয়ে বাচ্চাকে ধর্ষণ করা- এসব চিত্র যেন বেড়েই চলেছে সমাজে।

ধর্ষণের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু এর প্রতিকারের তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো আমাদের সমাজে ফলপ্রসূ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই নিজের বা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ বিষয়টি লোক লজ্জার ভয়ে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু এতে সমাজের বা ওই পরিবারের কোনো লাভ হয় না। বরং সমাজে ব্যাধিটির সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে একজন ধর্ষক হুমকি-ভয় দেখিয়ে অল্পতেই পার পেয়ে যায় এবং এমন কাজে ভবিষ্যতেও উৎসাহী থেকে যায়। তাই নিজেদেরকে সচেতন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এই সামাজিক ব্যাধিটি উৎখাত করতে হবে। একইসঙ্গে ধর্ষণের শিকার হলে সবাইকেই আইনের দ্বারস্থ হতে হবে। ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। তারপরও সমাজে এই অপরাধ বেড়েই চলেছে। তাই এ সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা জরুরি। আপনার পরিচিতি বা প্রতিবেশী কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হন তখন আপনি কী করবেন? এই করণীয় ঠিক না থাকার কারণে অনেক সময় আইনি লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একজন সচেতন নাগরিক, প্রতিবেশী, সবচেয়ে বড় কথা একজন মানুষ হিসেবে করণীয়টি জেনে রাখুন এবং ধর্ষিতাকে সাহায্য করুন। প্রশ্ন আসতেই পারে আপনি কী সাহায্য করবেন? নিচে দেওয়া হলো কীভাবে আপনি সহায়তা করতে পারবেন সেই উপায়গুলো।

১। ধর্ষণের ঘটনাটি নির্ভরযোগ্য কাউকে জানান যিনি নির্যাতিতাকে মানসিক সাহস দিতে পারবেন।২। সাক্ষী হিসেবে কাজে লাগানো যায় এমন কোনো বিশ্বস্ত মানুষকে জানান সে আত্মীয়, বন্ধু, পুলিশ, চিকিৎসকও হতে পারেন।৩। অবশ্যই ধর্ষিতাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়ে ফেলতে হবে।৪। কোনোভাবেই নির্যাতিতাকে গোসল করে আলামত নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। তাতে শারীরিক আলামতগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি পরনের কাপড়ও পরিষ্কার করা যাবে না। কাপড়গুলো পলিথিনে রাখা যাবে না বরং সেগুলো কাগজের ব্যাগে বা কাগজে মুড়িয়ে থানায় নিয়ে যেতে হবে।৫। সবচেয়ে দ্রুত যে কাজটি করতে হবে তা হলো নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে অভিযোগ জানাতে হবে। অভিযোগ যে কেউ করতে পারেন।৬।  ধর্ষণকারী যেসব জিনিসের সংস্পর্শে এসেছে, তার সব তুলে রাখুন৷ যেমন অন্তর্বাস, প্যাড ইত্যাদি৷ সম্ভব হলে এ সব জিনিসের ছবিও তুলে রাখুন৷৭। ধর্ষকের সাথে কোনভাবেই আপোষ করা যাবে না।

ধর্ষণের পর নির্যাতিতাকে নিয়ে সরাসরি থানায় গেলে থানা অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার পর পুলিশ আপনার মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন। এর মাধ্যমে নির্যাতিতা চিকিৎসা সহায়তা পান সেটা নিশ্চিত হবে এবং যেকোনো মেডিকেল প্রমাণও সংগ্রহ করা যাবে। বিব্রতকর অথবা কষ্টকর হলেও যত বেশী বিস্তারিত তথ্য দেয়া সম্ভব, তা পুলিশকে দিতে হবে। যদি নির্যাতিতা কোনো ঘটনার অংশ মনে করতে না পারেন, তবে তাদেরকে তাও জানান। এই হামলার ঘটনার পরে নির্যাতিতা নিজেকে পরিষ্কার করেছেন কি না তা জানান। ধর্ষণ বা যৌন আক্রমণের পূর্বে নির্যাতিতা কোনো ধরনের ড্রাগ অথবা এলকোহল নিয়েছিলেন কিনা তাও জানান।

যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তিনিই মামলার প্রধান সাক্ষী। তাঁর জবানবন্দি পুলিশকে গ্রহণ করতে হবে। তবে কোনো ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি বাধ্য নন।অনেকেই ভেবে থাকেন ডাক্তারি পরীক্ষা বা চিকিৎসা অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পূর্ণভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে হবে এবং তা বিনামূল্যে দিতে হবে। পরবর্তী চিকিৎসাও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে হবে।

আইনি সহায়তা পাওয়া নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কারণ 

প্রথমেই ভিকটিম পুলিশের কাছ থেকে সব রকম সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। জেলা জজের আওতায় প্রতিটি জেলায় আইন সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে আবেদন করলে ভিকটিম আর্থিক অথবা আইনজীবীর সহায়তা পেতে পারেন।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কাছে শেল্টার, আইনগত সহায়তা পেতে পারেন।

থানায় এবং হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে’ আইনগত ও চিকিৎসা পেতে পারেন।

আরেকটি বিষয়ে সোচ্চার হোন কখনো কোনো ধর্ষণের ঘটনায় আপস-মীমাংসা করা যাবে না। কারণ ধর্ষকের পরিচয় সে একজন ধর্ষক। তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। আজকে আপনি তার সঙ্গে আপস করলে সে কালকেই আরেকজনকে ধর্ষণ করবে। কোনোভাবেই কোনো ধর্ষককে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। সে নানা রকম ভয় দেখাতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন সে অপরাধী তার শক্তি কোনোভাবেই আপনার চেয়ে বেশি নয়। পৃথিবী সত্যি বদলেছে। কিন্তু ঘূণে ধরা আমাদের এই সমাজ আজও বদলায়নি। সমাজটা আমাদের। তাই এটাকে বদলিয়ে সভ্যতার স্বর্ণ শিখরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। রাষ্ট্র এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইন তৈরী করেছে। প্রয়োগের জন্য শক্তিশালী বাহিনী তৈরী করেছে। কিন্তু এই সব আইন প্রয়োগের জন্য আমাদেরকে উদ্যোগ নিতে হবে। সোচ্চার হতে হবে। অপরাধকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করার সাহস যোগাতে হবে। তবেই না সমাজ সভ্য হবে।
আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।
পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »