আপনার পরিবারের কেউ ক্রসফায়ারে মারা গেলে কি করবেন?

| প্রকাশিত হয়েছেঃ সোমবার, মে ১৪, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ বাংলাদেশে অতিপরিচিত শব্দ। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। হত্যা দুই ধরণের হয়। একটি হলো বিচার বিভাগীয় হত্যা অপরটি হলো বিচার বহির্ভূত হত্যা।


উপযুক্ত বিচার শেষে আইন অনুযায়ী যখন একজন অপরাধীকে হত্যা করা হয় তখন সেটি হয় বিচার বিভাগীয় হত্যা। অপর দিকে উপযুক্ত বিচার ছাড়াই বে আইনিভাবে কাউকে হত্যা করা হলে তা হবে বিচার বহির্ভূত হত্যা অর্থাৎ বিচার বিভাগীয় হত্যা ব্যতীত অন্য সব হত্যা বে আইনি ও অবৈধ। ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ যে নামেরই লেবেল লাগানো হোক না কেন আইন এই সব হত্যাকান্ডকে অনুমোদন দেয় না। একজন অপরাধী যতই ঘৃণ্য অপরাধ করুক না কেন উপযুক্ত বিচার পাওয়ার অধিকার তার আছে। এ অধিকার কখনো লংঘন করা যায় না। কারণ যেটা দেখা যায় সেটা ঘটে না। আবার যেটা ঘটে সেটা দেখা যায় না। এজন্য একজন ব্যক্তি যে আসলেই অপরাধ করেছে আদালতকে সে বিষয়ে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট হতে হয়। তারপর শাস্তির ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে আইন শৃংখলা বাহিনী আইনের তোয়াক্কা না করেই অবাধে মানুষ হত্যা করছে। সব সময় যে তারা প্রকৃত অপরাধীকেই হত্যা করছে তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপরাধ মানুষকে অপরাধীর লেবেল লাগিয়ে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হচ্ছে। অথচ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইন না জানার কারণে সঠিক প্রতিকার পান না বা সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন না।  কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের নামে বা আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা হলে উক্ত ব্যক্তির পরিবার নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ এর বিধান মোতাবেক পদক্ষেপ নিতে পারেন।


কোথায় অভিযোগ দায়ের করা যাবে?
এই আইনের ৭ ধারায় বলা হয়েছে যে-

৭। (১) ধারা ৫ ও ৬ এ বর্ণিত প্রক্রিয়া ছাড়াও কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া সত্ত্বে তৃতীয় কোন ব্যক্তি দায়রা জজ আদালতে অথবা পুলিশ সুপারের নিচে নয় এমন কোন পুলিশ কর্মকর্তার নিকট নির্যাতনের অভিযোগ দাখিল করিতে পারিবে।

(২) উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ সুপার অথবা তাহার চেয়ে ঊধ্বর্তন পদমর্যাদার কোনো অফিসার তাৎক্ষণিক একটি মামলা দায়ের ও অভিযোগকারীর বক্তব্য রেকর্ড করিবেন এবং মামলার নম্বরসহ এই অভিযোগের ব্যাপারে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে উহা অভিযোগকারীকে অবহিত করিবেন।

(৩) উপরে বর্ণিত উপ-ধারা (২) মোতাবেক অভিযোগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণকারী পুলিশ সুপার অথবা তাহার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দায়রা জজ আদালতে একটি রিপোর্ট পেশ করিবেন।

অভিযোগ দায়েরের পর কি হবে

অভিযোগ দায়েরর পর সংশ্লিষ্ট আদালত পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ টি প্রেরণ করবেন এবং মামলা দায়েরর নির্দেশ দিবেন। এক্ষেত্রে ৫ ধারায় বলা হয়েছে যে-

৫। (১) ধারা ৪ এর উপ-ধারা (১) (ক) অনুযায়ী বিবৃতি লিপিবদ্ধ করিবার পর আদালত অনতিবিলম্বে বিবৃতির একটি কপি সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের কাছে বা ক্ষেত্রমত, তদূর্ধ্ব কোন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করিবেন এবং একটি মামলা দায়েরের নির্দেশ প্রদান করিবেন।

(২) পুলিশ সুপার উক্ত আদেশ প্রাপ্তির পর পরই ঘটনা তদন্ত করিয়া চার্জ বা চার্জবিহীন রিপোর্ট পেশ করিবেনঃ

তবে শর্ত থাকে যে, সংশ্লিষ্ট সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যদি মনে করেন যে পুলিশ দ্বারা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত সম্ভব নয় সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি যদি আদালতে আবেদন করেন এবং আদালতে যদি তাহার আবেদনে এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদন যথার্থ সেক্ষেত্রে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবেন।

(৩) রিপোর্ট দাখিলের সময় তদন্ত কর্মকর্তা, ক্ষেত্রমত, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কর্মকর্তা ধারা ৪(১) এর অধীনে বিবৃতি প্রদানকারী ব্যক্তিকে তারিখসহ রিপোর্ট দাখিল সম্পর্কে আদালতকে অবহিত করিবেন।

(৪) উপরোল্লিখিত উপ-ধারা (৩) এর অধীনে নোটিশপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নোটিশ গ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে নিজে ব্যক্তিগতভাবে অথবা আইনজীবী মারফত আদালতে আপত্তি জানাইতে পারিবে।

(৫) আদালত সংঘটিত অপরাধের সংগে জড়িত ব্যক্তির পদমর্যাদার নিম্নে নহে এমন পদমর্যাদার কোন পুলিশ অফিসারকে মামলার তদন্ত অনুষ্ঠানের নির্দেশ প্রদান করিবেন।

নিরাপত্তার জন্য যে ব্যবস্থা 
অভিযোগ দায়ের করতে ভয় পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ভুক্তভোগী মনে করেন যে অভিযোগ দায়েরের পর তার উপর আরো বেশি নির্যাতন করা হতে পারে। তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। এজন্যই নির্যাতিত ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য ১১ ধারা অনুযায়ী আবেদন করার বিধান রাখা হয়েছে। ১১ ধারায় বলা হয়েছে-
১১। (১) অভিযোগকারী কোনো ব্যক্তি এই আইনে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিধানকল্পে দায়রা জজ আদালতে পিটিশন দায়ের করিতে পারিবে।

(২) রাষ্ট্র এবং যাহার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা চাওয়া হইয়াছে তাহাদেরকে উক্ত পিটিশনের পক্ষভুক্ত করা যাইবে।

(৩) পিটিশন গ্রহণ করিয়া আদালত বিবাদীকে সাত দিনের নোটিশ জারি করিবে এবং ১৪ দিনের মধ্যেই পিটিশনের ওপর একটি আদেশ প্রদান করিবে।

(৪) উপরে উল্লিখিত উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত এ ধরনের কোনো মামলা নিষ্পত্তিকালে আদালত প্রয়োজনবোধে ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যূন সাত দিনের অন্তরীণ আদেশ দিতে পারিবে এবং সময়ে সময়ে উহা বৃদ্ধি করিতে পারিবে।

(৫) আদালত এই আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধের তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতের আদেশ পালন নিশ্চিত করিবার নির্দেশ দিতে পারিবে।

(৬) আদালত নিরাপত্তা প্রার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিতে পারিবে এবং প্রয়োজনবোধে আদালত স্থানান্তর এবং বিবাদীর নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করাসহ নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।


এছাড়া এই আইনের অধীনে কৃত কোন অপরাধ যুদ্ধাবস্থা, যুদ্ধের হুমকি, আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা জরুরি অবস্থায়; অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সরকারি কর্তৃপক্ষের আদেশে করা হইয়াছে এইরূপ অজুহাত পুলিশ উথাপন করতে পারবে না। কারণ ১২ ধারা অনুযায়ী এই সব অজুহাত অগ্রহণযোগ্য করা হয়েছে। কাজেই পুলিশের বন্দুক যুদ্ধের নাটক এক্ষেত্রে গ্রহণীয় নয়।

অপরাধ দমনে বা অধিকার আদায় সোচ্চার হতে হবে। নিতে হবে দৃঢ় পদক্ষেপ। মনে রাখতে হবে নিরবে অত্যাচার সহ্য করা মানে অপরাধীকে অপরাধ সংঘটনে আরো প্রেরণা দেওয়া। তাই প্রতিবাদ করুন। এগিয়ে আসুন। চলুন একসাথে আমরা আইনের চাদরে মোড়ানো সোনার বাংলা গড়ে তুলি।

সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!

আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।
পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »