মিডিয়া ট্রায়াল সংস্কৃতি আর মানবাধিকারের মৃত্যু!!

পোষ্ট লিখেছেনঃ | প্রকাশিত হয়েছেঃ বুধবার, জুলাই ২৫, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
আপনি যদি কখনো দেখেন আপনার সামনে একজন লোক আরেক জন লোককে খুন করলো বা খুনের চেষ্টা করলো, তারপরও আপনি ঐ লোকটিকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারবেন না যদি না এবং যতক্ষন না ঐ অপরাধীর কৃত অপরাধটি উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে উপযুক্ত বিচার করে চুড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে। অনেক সময় আমরা যা দেখি তা ঘটে না আবার যেটা ঘটে সেটা দেখতে পাইনা। এজন্যই বাংলাদেশি আইন আপনাকে সেই অধিকার দেয়না। কারণ বাংলাদেশি আইন মূলত: কমন ল সিস্টেম নির্ভর। আমাদের আইন বলে যে, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃত বিচারে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নিরাপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। তার অর্থ হলো যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিরাপরাধ।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের আইন আদালত যখন একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিরাপরাধ বলছে তখন আমাদের দেশের  মিডিয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচার করে নায়ক বা খলনায়ক বানিয়ে সমাজে প্রচার করছে। মিডিয়ার এমন সংস্কৃতিকে ইংরেজিতে  Media Trial বা Trial By Media এবং বাংলায় এর অর্থ করা যায় 'গণমাধ্যমীয় বিচার'।আরো নির্দিষ্ট করে বললে একে 'সংবাদমাধ্যমীয় বিচার' বলা যেতে পারে।এই বিচার প্রকৃত অর্থে আদালতের বিচার ব্যবস্থার মত কিছু নয়।যখন সংবাদ মাধ্যম কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ক্রমাগত সংবাদ প্রচার করে জনগণের কাছে তাকে দোষী বা গুনী প্রমাণ করতে চায় তখন একে 'গণমাধ্যমীয় বিচার' বা মিডিয়া ট্রায়াল বলে।অনেক সময় আদালতে চলমান বিষয়ে বা মামলার রায়ের পরে অথবা আগে পত্রিকা,টেলিভিশন বা অনলাইন মিডিয়ায় অভিযুক্তকে 'নির্দোষ' অথবা 'দোষী' প্রমাণের চেষ্টায় সংবাদ প্রচার করতে দেখা যায়। মিডিয়া ট্রায়াল এখন প্রতিদিনকার ব্যাপার। মিডিয়া ট্রায়াল সব সময় উদ্দেশপ্রণোদিত হয়।এই ট্রায়াল পরবর্তীতে আমাদের মনোজগতকে মিডিয়ার উপনিবেশ করে তোলে।আমাদের নিজস্ব চিন্তাকাঠামোকে পলিটিসাইজড করে প্রভাবশালী গণমাধ্যম তাদের এজেন্ডা অনুয়ায়ী ভাবতে বাধ্য করে।মিডিয়া ট্রায়াল তথ্য সন্ত্রাসবাদের (Information Based Terrorism)একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে।

মিডিয়া ট্রায়াল এর নয়া একটি রূপ Social Media Trial।অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যে ট্রায়াল করা হয়।যেমন ধরুন একটি সংবাদ প্রচার হলো।সেখানে একজন ক জড়িত রয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত হয়েছেন। তো এটি কিন্তু প্রমাণিত না। ভিকটিমের বক্তব্য থাকতে পারে। কিংবা চূড়ান্ত আদালতে অন্য কিছু প্রমাণ হতে পারে।কিন্তু সেসব না ভেবে আমরা সোস্যাল মিডিয়ায় কাউকে দোষী বা নির্দোষী ধরে স্ট্যাটাস দিই। তারপর এটা যদি ভাইরাল হয়ে যায় তখন এই ট্রায়ালে একজনের মানহানী হয়ে যায়। তা অপূরনীয় ক্ষতি। সোস্যাল মিডিয়া ট্রায়াল অধিকাংশ সময় মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার অনুগামী হয়।অর্থাৎ যেকোন একটি বা একাধিক মাদারমিডিয়া প্রাথমিক রসদ সরবরাহ করে। আমরা সবাই নিজেদের বিচারক ভাবি। অন্যের বিষয়ে সহজেই জাজমেন্টাল হয়ে পড়ি। সামাজিক মাধ্যমগুলো (বিভিন্ন ব্লগ, ফেসবুক, পেজ) শুধুমাত্র বিরোধিতা করেই মানুষ ক্ষান্ত হচ্ছে না, করছেন গালিগালাজ, দিচ্ছে নানা কর্মসূচি। বিশেষ করে হুজুগে পড়ে নানা ধরনের গুজব/ মিথ্যা সংবাদ/ রিপোর্ট শেয়ার দিচ্ছে এবং এটি থেকে অনেক সময়ই ঘটছে সাম্প্রদায়িক হামলার মতো বড় বড় ধরনের ঘটনা। সেটি শুধু শেয়ারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জারি আছে ফেসবুকে ট্রায়াল। এখন একটা কিছু হলেই লোকজন সেটিকে ফেসবুকে নিয়ে যাচ্ছে, সামাজিক ট্রায়ালের জন্য। কারো বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উত্থাপিত হলো, সঙ্গে সঙ্গে সেই অভিযোগের তদন্ত কিংবা আইনগত প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ার আগেই হয়ে যান তিনি আসামি এবং সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেই বিষয়ে রায় দেওয়ার জন্য। তারপর শুরু হচ্ছে সেখানেই সেই ব্যক্তির সামাজিক মৃত্যু। কারও ছবি তোলা, কথা কিংবা মিটিং রেকর্ড করার বিষয়ে অনুমতি নেওয়ার সংস্কৃতি নেই, বরং আছে উল্টোটা। সেগুলো মনের মতো করে ফেসবুকে আপলোড দেওয়া, তার সঙ্গে কমেন্ট জুড়ে দিয়ে সবাইকে জানান দেওয়া হয়। লেখা বা মতামতের বাইরে ছবি নিয়ে শুরু হয় মিডিয়া বিচার। কোনও ভুয়া নিউজ নিয়েও এমন বিষয় তৈরি হয়। মিডিয়া এই ট্রায়ালের বিষয়ে কোনও নীতিমালা আমাদের দেশে নেই। যা আছে সবই আইসিটি আইনে মূল ধারা বা যা ৫৭ ধারা।

আমাদের আইনি ব্যবস্থা অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধীর মধ্যে সুস্পষ্ঠ সীমা রেখা টেনে দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্পর্শকাতর বিভিন্ন ঘটনায় আটককৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরকে আটক করে ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন করে বা না করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করাটা যেন একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে আটক করে জেএমবি, ডাকাত, খুনি, চরমপন্থি ইত্যাদি লেবেল তাদের বুকে ঝুলিয়ে দিয়ে গণমাধ্যমে তাদের বিচার করা হচ্ছে। এতে করে ঐ অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকৃত বিচারে দোষী সাব্যস্থ হওয়ার আগেই কোটি কোটি মানুষের কাছে অপরাধী হিসেবে গন্য হচ্ছেন।

সাধারণ মানুষ তাদেরকে গালি দিচ্ছে বা ঘৃণা করছে। অথচ প্রকৃত বিচারে দেখা গেছে এই সকল অভিযুক্তদের অনেকেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পেয়ে গেছেন। বিষয়টি মানবাধিকারের চরমলঙ্ঘণ হলেও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে কোন উচ্চবাচ্য নেই। নেই সরকারের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ। এসব বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্বেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কে বুড়ি আঙ্গুল দেখিয়ে একটি মহল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করে অনবরত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে। আমরা কম বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নির্যাতনের কথা প্রায়শ:ই শুনে থাকি। এমনকি হতে পারে না যে, আপনি চাঁদা দিলেন না বা আইনশৃঙ্খলা  বাহিনীর চাহিদা পুরণ করতে পারলেন না বিধায় আপনাকে গ্রেফতার করা হলো আর গণমাধ্যমে আপনাকে উপস্থাপন করে বুকে লিখে দেয়া হলো যে আপনি একজন চরমপন্থি? আপনাকে গণমাধ্যমে কিছু বলারই সুযোগ দেয়া হলো না আপনার আত্মপক্ষ সমর্থনে অথচ আপনার বিচার হয়ে গেল! কোটি কোটি চোখের সামনে আপনার বিচার হলো। দোষ না করেও আপনি দোষী হয়ে গেলেন। কে চরমপন্থি আর কে ভাল, কে খুনি আর কে ভুক্ত ভোগি এটা নির্ধারণ করার জন্যই তো আদালত।

আবার উল্টোটা ভেবে দেখুন, এই সকল অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে প্রমাণিত হলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বা গণমাধ্যম তাকে পূণরায় গণমাধ্যমে তুলে ধরে বলেন না- এই ব্যক্তি আসলে নিরাপরাধি। সে কথিত অপরাধটি করেনি। ফলে নির্দোষী হওয়া সত্বেও সারা জীবন এই অভিযুক্ত ব্যক্তি সমাজের চোখে একজন অপরাধীই হয়ে রয়। বিষয়টি বড্ড অমানবিক। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সম্মান ও সুনাম নিয়ে সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার সকলের রয়েছে। এই অধিকার কোনভাবে লঙ্ঘন করা যায় না। আর লঙ্ঘন হলেও তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অচিরেই এমন অমানবিক কর্মকান্ড বন্ধ হোক সাধারণ মানুষ হিসেবে এটাই আমাদের কামনা।


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!


আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।
পোস্টটি শেয়ার করুন

Previous
Next Post »