যে কারণে বন্ধ করা যায়নি ভারতীয় টিভি চ্যানেল

| প্রকাশিত হয়েছেঃ রবিবার, নভেম্বর ১৮, ২০১৮ | ভয়েস বিভাগঃ
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত এবং জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল গুলোর মধ্যে “স্টার জলসা, স্টার প্লাস এবং জি বাংলা” অন্যতম। বিশেষ করে বাংলাদেশী মা বোনদের নিকট ভারতীয় এই টিভি চ্যানেলগুলির সিরিয়াল তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই সিরিয়াল গুলিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা।

 ২০১৪ সনের আগস্ট মাসে দৈনিক খবরের কাগজের কিছু শিরোনাম তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। ০২/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় “পাখির প্রেমে প্রাণ বিসর্জন” শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয় যেখানে দাবি করা হয় পাখি ড্রেস না কিনে দেওয়ায় এক তরুণী আত্মহত্যা করেছে। ১০/০৮/২০১৪ ইং তারিখে অন্য একটি দৈনিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় “স্টার জলসা দেখতে না পেরে আত্মহত্যা” শিরোনামে।  বিগত ০৪/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকায় “পাখি না পেয়ে  এবার আত্রাইয়ে স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা” শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। একই দিনে দৈনিক ভোরের কাগজের শিরোনাম ছিল “সরিষা বাড়িতে ভারতীয় টিভি চ্যানেল বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন” । ০৯/০৮/২০১৪ ইং তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠ পত্রিকা “ভারতীয় সিরিয়াল দেখতে না দেওয়ায় সাভারে স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যা” শিরোনামে খবর প্রকাশ করে।

এই সব খবর পড়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে ভারতীয় উক্ত তিনটি চ্যানেল বন্ধ ঘোষণা করার জন্য রীট পিটিশন ফাইল করেন। উক্ত রীট পিটিশনে তিনি দাবি করেন ভারতীয় এই সব চ্যানেলের পরিবেশক ও এজেন্টগণ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ৩ ধারা মোতাবেক সরকারের নিকট থেকে  কোন অনুমোদন না নিয়ে এই সকল টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করছে। এছাড়া তারা সরকারকে অর্থ প্রদান না করে ধারা ২২ ও ৩২ এর বিধানাবলী লঙ্ঘন করছে। পিটিশনার আরও দাবি করেন যে, ভারতীয়  এই সব টিভি চ্যানেল ১৯ ধারা বিধান লঙ্ঘন করে যে সকল প্রোগ্রাম সম্প্রচার করছে সেগুলি বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। তাদের সম্প্রচারিত প্রোগ্রাম দেখে বাংলাদেশি তরুণীরা আত্মহত্যা করছে। বিপথগামী হচ্ছে। সংসারে কলহ বাড়ছে। এত কিছু ঘটা সত্বেও সরকারীভাবে এই সব চ্যানেল বন্ধের কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ উক্ত রীটের প্রেক্ষিতে সরকার এবং অন্যান্য পক্ষগণের বিরুদ্ধে রূল জারী করেন।

সরকার পক্ষ এবং ডিগি জাদু ব্রডব্যান্ড লিঃ ও ন্যাশন ওয়াইড মিডিয়া লিঃ জবাবে বলেন তারা সরকরের অনুমোদন নিয়ে এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করে আইনগতভাবে “স্টার জলসা, স্টার প্লাস এবং জি বাংলা” সম্প্রচার করছে। তারা দাবি করেন যে, এইসব চ্যানেলে এমন কোন প্রোগ্রাম সম্প্রচার করা হচ্ছে না যা বাংলাদেশের সমাজ সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানে। বরং এইসব চ্যানেলগুলি ভাল ভাল প্রোগ্রাম সম্প্রচার করছে বলেই দিন দিন এইসব চ্যানেল সবার নিকট জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সকল পক্ষকে শোনার পর গত ২৯/০১/২০১৭ ইং তারিখের রায় ও আদেশ দ্বারা রুল খারিজ করে দেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ধারা ১৫, ১৮, ১৯, ২৮ ও ২৯ বিশ্লেষণ করে রূলটি খারিজ করেন।

এখন দেখা যাক “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ধারা ১৫, ১৮, ১৯, ২৮ ও ২৯ এ কি আছে।

অনুমোদিত চ্যানেল সঞ্চালন বা সম্প্রচার স্থগিতকরণ, ইত্যাদি

১৫৷ (১) অনুমোদিত কোন চ্যানেল বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচারকালে যদি সরকারের নিকট এই মর্মে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান ধারা ১৯ এর পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার তাত্ক্ষণিক বা, ক্ষেত্রমত, যাচাইপূর্বক উক্ত চ্যানেলের বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচার সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারিবে৷ 
(২) স্থায়ীভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়া কোন চ্যানেলের বিপণন, সঞ্চালন বা সম্প্রচার উক্ত চ্যানেলের ডিসট্রিবিউটরের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার উপযুক্ত মনে করিলে, নির্ধারিত ফি পরিশোধ সাপেক্ষে, পুণরায় চালু করিবার নির্দেশ দিতে পারিবে৷

গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি

১৮৷ (১) এই আইনের অধীন সেবাপ্রদানকারী কর্তৃক প্রদত্ত সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কোন অভিযোগ থাকিলে উহা সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিতভাবে পেশ করা যাইবে৷

(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন অভিযোগ প্রাপ্তির পর লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ উহার যথার্থতা যাচাইপূর্বক সেবাপ্রদানকারীকে তদ্‌বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়টি অনধিক ৭ (সাত) দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করিবার জন্য নির্দেশ দিতে পারিবে এবং নির্দেশ পালনের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ উহার লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িকভাবে স্থগিত করিতে পারিবে৷

সম্প্রচার বা সঞ্চালনের ক্ষেত্রে বাধা-নিষেধ


১৯৷ সেবাপ্রদানকারী কেব্‌ল্‌ টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যেসব অনুষ্ঠান সম্প্রচার বা সঞ্চালন করিতে পারিবে না তাহা নিম্নরূপ, যথাঃ-

(১) দেশের অখন্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আর্দশের পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(২) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৩) হিংসাত্মক, সন্ত্রাস, বিদ্বেষ ও অপরাধসম্বলিত কোন অনুষ্ঠান;

(৪) বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় সংহতি ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৫) জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ হানিকর কোন অনুষ্ঠান;

(৬) দেশের কোন সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর আবেগ অনুভূতিতে আঘাত হানিতে পারে এমন কোন অনুষ্ঠান;

(৭) The Censorship of Films Act, 1963 (Act No. XVIII of 1963) বা উহার অধীন প্রণীত বিধি বা নীতিমালার পরিপন্থী কোন অনুষ্ঠান;

(৮) অশালীন বা আক্রমণাত্মক কোন রসিকতা, অঙ্গভঙ্গী, নৃত্যগীত, বিজ্ঞাপন, সংলাপ বা সাবটাইটেল সম্বলিত কোন অনুষ্ঠান;

(৯) নগ্নতা, নগ্ন ছায়াছবি, বস্ত্র উম্মোচন দৃশ্য, দেহ প্রদর্শন, অশোভন অংগভঙ্গী, যৌনক্রিয়ার ইংগিত সূচক বা প্রতীকী নাচ অথবা অশোভন দৃশ্যাবলী সম্বলিত এমন কোন অশ্লীল অনুষ্ঠান;

(১০) উচ্ছৃংখলতা, ধ্বংসযজ্ঞ, শিশু-কিশোর অপরাধ বা অপ-সংস্কৃতিকে আর্কষণীয় ও উত্সাহিত করিতে পারে বা শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ক্ষতির কারণ হইতে পারে এমন কোন অনুষ্ঠান;

(১১) মূল তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন না রাখিয়া সম্প্রচারিত এমন কোন অনুষ্ঠান;

(১২) অন্য কোন আইন দ্বারা বারিত বা সেন্সরকৃত ছায়াছবি বা কোন অশ্লীল অনুষ্ঠান;

(১৩) বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য বিদেশী কোন চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন;

(১৪) সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের দর্শকদের উদ্দেশ্যে বিদেশী চ্যানেলের কোন অনুষ্ঠান সম্প্রচার৷

শাস্তি

২৮৷ (১) এই আইনের অধীন ধারা ৩, ৪, ৭(৩) ও (৪), ১৬, ১৭(২), ১৭(৩), ১৭(৫), ১৯, ২১, ২২, ২৩, ও ২৫ এর কোন বিধান লঙ্ঘন হইবে একটি অপরাধ৷

(২) যদি কোন ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ২ (দুই) বত্সর সশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ১(এক) লক্ষ টাকা কিন্তু অন্যুন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং অপরাধ পূনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বত্সর সশ্রম কারাদন্ড বা অনধিক ২ (দুই) লক্ষ্য টাকা কিন্তু অন্যুন ১(এক) লক্ষ্য টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন৷

(৩) এই আইনের অন্যান্য বিধান সাপেক্ষে, বিধি দ্বারা কতিপয় অপরাধ চিহ্নিত এবং উক্ত অপরাধ সংঘটনের জন্য দণ্ড নির্ধারণ করা যাইবে, তবে এইরূপ দণ্ড ১ (এক) বত্সর সশ্রম কারাদণ্ড বা ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের অতিরিক্ত হইবে না৷

অপরাধের বিচার

২৯৷ Code of Criminal Procedure, 1898 (Act No. V of 1898) বা অন্য আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনে বর্ণিত সকল অপরাধ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটান এলাকায় মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য হইবে৷

উক্ত আইনের বিধান মতে সরকার, লাইসেন্সিং অথরিটি এবং কোর্ট কোন টিভি চ্যানেল বন্ধের ক্ষমতা রাখে। রীটের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয় তাহলো যদি অন্য কোথাও কোন প্রতিকার ্পাওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে সেই সুযোগ গ্রহণ না করে হাইকোর্টে রীট ফাইল করা যাবে না। আমরা যে রীটের বিষয়টি আলোচনা করেছি সেখানে রীটকারী পত্রিকার খবর পড়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট ফাইল করেছেন। অথচ “কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬” এর ১৫ ও ১৮ ধারায় বলা হয়েছে যে, যদি কোন টিভি চ্যানেল সম্পর্কে কারও অভিযোগ থাকে তাহলে উক্ত টিভি চ্যানেল সম্পর্কে সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটির নিকট অভিযোগ করতে হবে। সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটি উক্ত অভিযোগ তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। সরকার বা লাইসেন্সিং অথরিটির নিকট কোন অভিযোগ না করে সরাসরি রীট করাই উক্ত রীট  পিটিশনটি খারিজ করা হয়েছে। রীটকারী আইনজীবীর উচিত ছিল প্রথমে সংশ্লিষ্ট অথরিটির নিকট আবেদন করা। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট অথরিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে তখন রীট ফাইল করার কারণ তৈরী হতো এবং ভাল একটা ফলাফল পাওয়া যেত। যেহেতু রীটটি খারিজ হয়েছে সেহেতু ভারতীয় এইসব টিভি চ্যানেল বাংলাদেশে সম্প্রচার হতে আইনগতভাবে আর কোন বাধা রইলো না।


সুপ্রিয় লিখিয়ে পাঠক! আপনি জেনে নিশ্চয় আনন্দিত হবেন যে, আইন সচেতন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এই উদ্যোগ। চাইলে আপনিও হতে পারেন এই গৌরবের একজন গর্বিত অংশীদার। আমাদের ব্লগে নিবন্ধন করে আপনিও হতে পারেন আমাদের সম্মানিত লেখক। লিখতে পারেন আইন-আদালত, পরিবেশ, ইসলামী আইন যেমন কোরআন, হাদিসের আইনগত বিষয়, প্রাকৃতিক আইন, বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কিত প্রতিবেদন বা অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি, অন্যায়, দূর্নীতি, হয়রানী, ইভটিজিং, বেআইনী ফতোয়া, বাল্য বিবাহ ইত্যাদিসহ যাবতীয় আইনগত বিষয়াবলী নিয়ে। আমাদের ব্লগের সদস্য হোন আর হারিয়ে যান জ্ঞান বিকাশের এক উন্মুক্ত দুনিয়ায়!



আপনি কি আমাদের ব্লগে লিখতে আগ্রহী? তাহলে এখানে নিবন্ধন করুন। আপনার কি কিছু বলার ছিল? তাহলে লিখুন নিচে মন্তব্যের ঘরে।
পোস্টটি শেয়ার করুন

Next
This is the current newest page
Previous
Next Post »