Search Suggest

অবসর গ্রহণের পর কি ঠুনকো অজুহাতে পেনশন আটকে দেওয়া যায়? জানুন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও আইনি ব্যাখ্যা



অবসর গ্রহণের পর কি ঠুনকো অজুহাতে পেনশন আটকে দেওয়া যায়? জানুন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও আইনি ব্যাখ্যা


সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে 'পেনশন' কেবল কিছু টাকা নয়, এটি তাদের সারাজীবনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল এবং শেষ বয়সের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অবসরে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে (যেমন- সরকারি বাসা ছাড়েননি, কিছু টাকা পাওনা আছে ইত্যাদি) পেনশন আটকে দেয়।

পেনশন কি চাইলেই আটকে দেওয়া যায়? আইন কী বলে? আজ আমরা আলোচনা করবো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় নিয়ে, যা প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর জেনে রাখা জরুরি।

মামলার তথ্য ও সাইটেশন (Citation)
এই রায়টি সরকারি কর্মচারীদের অধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক।
> মামলার নাম: মো. সানাউল্লাহ বনাম বাংলাদেশ সরকার এবং অন্যান্য
> রেফারেন্স (Citation): 75 DLR (AD) 89
> আদালত: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, আপিল বিভাগ
> রায় প্রদানের তারিখ: ২৫ এপ্রিল, ২০২২

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
জনাব মো. সানাউল্লাহ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিটিসিএল (BTCL)-এ দীর্ঘ ৩১ বছর অত্যন্ত সততার সাথে চাকরি করেছেন। তার চাকরি জীবনে কোনোদিন কোনো শাস্তি বা দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না।
তিনি সম্মানের সাথে অবসরে যান। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন তিনি তার পেনশনের টাকা দাবি করেন। ২০১৩ সালে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে একটি আদেশ জারি করে তার পেনশন বন্ধ করে দেয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল দুটি:
১. সানাউল্লাহ অবৈধভাবে বিটিসিএল-এর জমি দখল করে ঘর বানিয়ে থাকছেন।
২. টেলিফোন বিল বাবদ সরকারের তার কাছে ৩৪,৭০৯ টাকা পাওনা আছে।
কর্তৃপক্ষ বলে, "আগে জমি ও টাকা ফেরত দিন, তারপর পেনশন পাবেন।" সানাউল্লাহ আদালতে যান। শেষ পর্যন্ত মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গড়ায়।

আইনি বিষয় ও আদালতের ব্যাখ্যা 
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কিছু আইনি প্রশ্নের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আইনের ছাত্র না হয়েও যাতে আপনি বিষয়গুলো বুঝতে পারেন, সেজন্য নিচে বাস্তব উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো।

১. অবসরের সময় কি কোনো মামলা ছিল? (টাইমিং ইজ ইম্পর্ট্যান্ট)
আইন: Public Servants (Retirement) Act, 1974-এর ১০ ধারা।
সহজ ব্যাখ্যা: আইন অনুযায়ী, সরকার একজন কর্মচারীর পেনশন তখনই আটকাতে পারে, যদি ওই কর্মচারী অবসরে যাওয়ার দিন তার বিরুদ্ধে কোনো বিচারিক মামলা বা বিভাগীয় মামলা (Departmental Proceeding) চলমান থাকে।

বাস্তব উদাহরণ:
ধরুন, আপনি আজ অবসরে যাচ্ছেন। আজ বিকেল ৫টা পর্যন্ত আপনার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির তদন্ত বা মামলা নেই। কাল সকালে অফিস আপনাকে নোটিশ দিয়ে বলতে পারবে না যে, "আপনার পেনশন বন্ধ, কারণ আমরা আপনার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করবো।" পেনশন আটকাতে হলে মামলাটি অবসরের আগেই শুরু হতে হবে।

সানাউল্লাহর ক্ষেত্রে, তিনি যখন অবসরে যান, তখন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। অবসরের এক বছর পরেও কোনো মামলা হয়নি। তাই হুট করে পেনশন আটকানো বেআইনি।

২. মুখের অভিযোগ বনাম আইনি প্রমাণ
কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছিল যে সানাউল্লাহ জমি দখল করে আছেন। কিন্তু আদালত বলেছেন, এটি কেবল একটি মৌখিক অভিযোগ। জমি দখলের বিষয় নিয়ে দেওয়ানি আদালতে আলাদা মামলা চলতে পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে পেনশনের মতো মৌলিক অধিকার হরণ করা যাবে না।
বাস্তব উদাহরণ:
মনে করুন, অফিসের পিয়ন দাবি করলো আপনি অফিসের একটি চেয়ার ভেঙেছেন, তাই সে আপনাকে অফিস থেকে বের হতে দেবে না। এটা কি সম্ভব? না। চেয়ার ভাঙার বিচার আলাদা হবে, কিন্তু আপনার বাড়ি যাওয়ার অধিকার আটকানো যাবে না। ঠিক তেমনি, জমি বা টাকার পাওনা নিয়ে সরকার আলাদা মামলা করতে পারে, কিন্তু পেনশন আটকাতে পারে না।

৩. পেনশন কোনো দয়া নয়, এটি অধিকার
আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, পেনশন কোনো ভিক্ষা বা দয়া নয়। এটি একজন কর্মচারীর অর্জিত অধিকার (Right)। কোনো ঠুনকো অজুহাতে বা অযৌক্তিক কারণে এটি কেড়ে নেওয়া যায় না।
৪. সার্ভিস রুলস বা চাকরির বিধিমালা কী বলে?
চাকরির বিধিমালা (Rule 247, Part-1) অনুযায়ী, যদি কোনো কর্মচারী সরকারের আর্থিক ক্ষতি করে, তবে পেনশনের টাকা থেকে তা কেটে নেওয়া যায়। কিন্তু শর্ত হলো:
 * সেই ক্ষতির তদন্ত বা মামলা অবসরের আগেই শুরু হতে হবে।
 * অথবা, অবসরের সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে শুরু করতে হবে।
সানাউল্লাহর ক্ষেত্রে সরকার এই সময়ের মধ্যে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। তাই পেনশন কাটার সুযোগ নেই।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের যুক্তি খারিজ করে দেন। আদালত বলেন:
১. মো. সানাউল্লাহর বিরুদ্ধে অবসরের সময় কোনো মামলা ছিল না।
২. জমি দখল বা সামান্য টাকা পাওনার অজুহাতে পেনশন বন্ধ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
৩. কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সানাউল্লাহর প্রাপ্য পেনশন বুঝিয়ে দিতে হবে।
এই রায় থেকে আমাদের শিক্ষা
আপনি যদি একজন সরকারি চাকরিজীবী হন, তবে এই রায়টি আপনার জন্য একটি ঢাল বা রক্ষাকবচ।

অবসরের পর অফিস যদি হঠাৎ কোনো পুরনো অজুহাত তুলে পেনশন আটকাতে চায়, তবে জানবেন তা বেআইনি।
 
যদি আপনার বিরুদ্ধে অবসরের আগে কোনো মামলা পেন্ডিং না থাকে, তবে পেনশন পাওয়া আপনার আইনগত অধিকার।
 
সামান্য পাওনা বা অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পেনশন বন্ধ করা যায় না।

এই আর্টিকেলটি শেয়ার করে আপনার সহকর্মী ও পরিচিতদের সচেতন করুন। আইনের সঠিক জ্ঞানই আপনাকে ভোগান্তি থেকে বাঁচাতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন